[ আ লো ক পা ত ]
সম্পর্কের আরও অবনতি ও
অবিশ্বাস যখন বাস্তবতা
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৬
বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে মেনে নেয়া হয়নি বলেও নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে মেনে নিতে রাজি নন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী। সিলেটে আয়োজিত জনসভায় তিনি এও বলেছেন, ‘আপনি তো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।’ এভাবে বললে বোধহয় আরও ভালো হয়— শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। আরও বলতে হয়, বর্তমান সংবিধানে তার রয়েছে প্রায় সর্বময় ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির যেমন ক্ষমতা থাকে, প্রায় সে রকম ক্ষমতা রয়েছে তার। কারণ আরও অনেক কিছুর মতো নামেই আমরা চালু করেছি সংসদীয় ব্যবস্থা। এ বিষয়ে আমাদের চেতনাও জাগ্রত হচ্ছে অনেক দেরিতে ও ধীরে। এখানে যেটি না বললে অন্যায় হবে, তা হলো খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনিও একই রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। একইভাবে শাসন করেছিলেন তার দল, সংসদ ও সরকারকে।
আমরা কি এও দেখিনি, তার শাসনামলের রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে যাওয়ার পর কীভাবে বেগম জিয়ার কথামতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতেন? এর প্রতিবাদে ড. আকবর আলি খানসহ ওই সরকারের চার উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হয়। ইয়াজউদ্দিন সাহেব এখন প্রয়াত। তার প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে কিছু বলা ঠিক হবে না। তাছাড়া তিনি তো আর কারও বক্তব্যের জবাব দিতে পারবেন না। তবে এটা বলতে হবে, বেগম জিয়া নেপথ্য থেকে তাকে নিয়ন্ত্রণে যে ভূমিকা তখন রেখেছিলেন, সেটি না করলে ইয়াজউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বেও হয়তো একটা মোটামুটি মানসম্মত জাতীয় নির্বাচন হয়ে যেত। অনেক ঘটনার পর প্রায় দুই বছর পরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির (সঙ্গে জামায়াতের) যে দশা হয়, তা এড়ানোও সম্ভব হতো মনে হয়। জাতীয় সংসদটি একটু ভারসাম্যপূর্ণ হতো তখন। দেশ পরিচালনাসহ রাজনীতিতেও হয়তো পড়তো এর কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব। পেছন ফিরে তাকালে আওয়ামী লীগের এমন অভিযোগ তো উড়িয়ে দেয়া যায় না, বিএনপি তথা বেগম জিয়ার কারণেই নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিতর্কিত হয়ে পড়েছিল।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিতর্কিত ও ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কারণেই ঘটে ওয়ান-ইলেভেন। বেগম জিয়ার একান্ত অনুগত ইয়াজউদ্দিন সাহেবকে তখন একটি সেনাসমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে করুণভাবে দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। একজন রাষ্ট্রপতির এমন পরিণতি ও নিজেদের দুর্ভাগ্য তারা কি ডেকে এনেছিলেন কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে না পেরে? তাকে নিয়ে বড় দুই দলের জেদাজেদির মধ্যে পড়ে বিব্রত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা জানিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তাকে সামনে আনার জন্য বিএনপি সরকার বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়স বাড়িয়েছিল, এমন অভিযোগ দেশের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ। অনেকেই বলেন, কে এম হাসান সাহেবের উচিত ছিল আরও আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা জানানো। তাহলে পরিস্থিতি হয়তো-বা অত জটিল হতো না। আওয়ামী লীগ খুঁজে বের করেছিল, অনেক আগে তিনি ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। উচ্চ আদালতের বিচারপতি হিসেবে তার পারফরম্যান্স বিবেচ্য হয়নি দলটির কাছে— সত্যের খাতিরে এটাও বলতে হয়। অনেকে বলেন, তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নেয়া হলেও নির্বাচনটা খারাপ হতো না। তাতে নাকি আওয়ামী লীগই জয়যুক্ত হতো। কী হতো না হতো, সে আলোচনায় গিয়ে অবশ্য কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। যা ঘটে গেছে, তার পর্যালোচনাই কেবল আমরা করতে পারি। আর এতে বলতে পারি, তখন বিএনপির এত চালাকি ও কারসাজি করার কোনো দরকার ছিল না। ফল তো ভালো হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ যেটা করছে, তার ফল কী হবে?
সর্বোচ্চ আদালতের একটি রায় বেরুতে না বেরুতে বর্তমান সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটাই বাতিল করে দিয়েছে। সরকারপ্রধানের এক কথা, তত্ত্বাবধায়ক মানে ওয়ান-ইলেভেন। কী আশ্চর্য, খোলাখুলি বলছেন প্রধানমন্ত্রী— আপনাকে ধরবে, আমাকেও ধরবে! আবারও ওয়ান-ইলেভেন ঘটলে কী হবে, আমরা তো কেউ জানি না। ইতিহাসে একই ঘটনা নাকি একইভাবে ঘটে না। ভিন্নভাবে ওয়ান-ইলেভেন ঘটুক, এটাও কারও কাম্য নয়। কিন্তু সে লক্ষ্যে তো কাজ করতে হবে। নির্বাচনকালে বা কোনো কালে কোনো ধরনের অনির্বাচিত সরকার গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না, এটা বুঝতে সর্বোচ্চ আদালতে রিট করতে হবে কেন? দীর্ঘ সেনাশাসন থেকে বেরুনোর সময়টায় বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কাল থেকেই বোদ্ধারা বলে আসছেন— এটা গণতন্ত্রসম্মত নয়; আর তাই এ থেকেও যত দ্রুত সম্ভব বেরুতে হবে। এ লক্ষ্যে (অন্তত ভারতের অনুসরণে) নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সব রকম নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার কথা কত না বলা হয়েছে! সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও সবার খুব ভালো করে জানা। অব্যাহত দলীয়করণের মাধ্যমে এদের বিনষ্ট না করার কথা কি কম বলা হয়েছে? নব্বইয়ের পর গণতন্ত্র-গণতন্ত্র জপ করে যেসব সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার কোনো একটিও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে— সুষ্ঠুভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করেছি? হ্যাঁ, কোনো একটি শাসনামলে নির্বাচন কমিশন হয়তো ছিল বেশি আজ্ঞাবহ আর বেশি হাস্যকর। হ্যাঁ, বর্তমান সরকার হয়তো কিছু উপ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হতে দিয়েছে। এও ঠিক, ভোটার তালিকা সংশোধনের ঐতিহাসিক কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আগেকার মতো করে কারচুপি এখন আর সম্ভব নয়। তারপরও বিদ্যমান বাস্তবতায় এটা বলার সুযোগ কি উপস্থিত হয়েছে যে, একটি দলীয় সরকারের অধীনেই এমন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হওয়া সম্ভব— ‘রাষ্ট্রক্ষমতা’ হস্তান্তর হবে যার মাধ্যমে?
এটি যে সে ক্ষমতা কিন্তু নয়— রাষ্ট্রক্ষমতা। আর তা দু’তিন বছরের জন্যও নয়— পাক্কা পাঁচ বছরের জন্য। আমরা তো জানি, প্রচলিত ব্যবস্থায় দেশটাকে এক রকম ‘ইজারা’ নেয় নির্বাচনে বিজয়ী দল। প্রায় সব ক্ষেত্র থেকে বিরোধী দলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন তারা। তৃণমূল পর্যন্ত তাদের ওপর চলে দমন-পীড়ন তথা ‘মার্জিনালাইজেশন’। দেশ পরিচালনার এই যে দৃশ্যপট, সেটি বদলাতেও কি কোনো সরকার উদ্যোগী হয়েছে এ পর্যন্ত? নাকি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে তারা? পরিস্থিতির অবনতি মানে ক্ষমতা নিয়ে সংগ্রামরত দুই পক্ষে সম্পর্কের আরও অবনতি। সিলেটের জনসভায় বেগম জিয়ার উক্তি এখানে উদ্ধৃত করতে হয়। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ হলো সাপের থেকেও খারাপ। সাপকে বিশ্বাস করা গেলেও আওয়ামী লীগকে নাকি যায় না! এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে সংবিধানে যাই লেখা থাকুক— বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে তিনি এমন একটা নির্বাচনে যাবেন কীভাবে, যেটির ওপর রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া-না যাওয়া নির্ভর করছে? এ ধরনের নির্বাচনে যদি অল্প ব্যবধানেও জিততে না পারে তার দল, তাহলে কী হবে? বিদ্যমান ব্যবস্থায় আরও পাঁচ বছর দল ধরে রাখাই তো কঠিন হয়ে পড়বে তার পক্ষে। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ যে বিএনপির ওপর আরও কঠোর মনোভাব নিয়ে চড়াও হবে, এ বিষয়েও তিনি নিঃসন্দেহ। নিঃসন্দেহ এ কারণেও যে, এটা হলো সংস্কৃতি অর্থাত্ তারাও এটি করতেন। এর বাইরে তারা আসলে কিছু ভাবতে পারছেন না। ভাবতে পারতেন— যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে শুধু দলবাজি না করে উভয় পক্ষই গণতন্ত্রের জন্য ‘মিন’ করে, আন্তরিকভাবে কিছু করতেন। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা অবশ্য বলতে পারবেন, কিছু সুষ্ঠু উপ ও স্থানীয় নির্বাচন ‘উপহার’ দিয়েছেন তিনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, দায়িত্ব পালন করাকেও উপহার বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে— জনগণের কাছে!
বিচারপতি কে এম হাসানকে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে না পারা আওয়ামী লীগ এখন বলছে তার দলীয় প্রধানকে এ পদে মেনে নিতে। এটা সম্ভব হতো— যদি এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন একটা দারুণ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এদেশে দাঁড়িয়ে যেত আর জনপ্রশাসন হয়ে উঠত দলবাজিমুক্ত তথা পেশাদার। আরও একটি শর্ত পূরণ হওয়া এক্ষেত্রে জরুরি— যদি দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হতো। তাহলে কিন্তু তৃণমূল পর্যন্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা ইতিবাচক পরিবর্তনই যেত ঘটে। সমাজ জীবনেও এর কিছু সুফল পেতাম। এসব কথা কিন্তু মুখে বলা হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনে অনেক শিক্ষা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের— এমন একটা ভাব নিয়ে বর্তমান সরকারই কিন্তু এসব আমাদের বলেছিল ঘটা করে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ঠিক বিশ্বাস না করলেও হয়তো কিছুটা আশাবাদী হয়েছিলেন তখন। হয়তো ভেবেছিলেন, কিছু উন্নতি হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। তা হয়েছে কিনা— ক্ষমতাসীন দলই বলুক। বিরোধী দলকে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। সিলেটে রাখা বেগম জিয়ার বক্তব্যেই তা পরিষ্কার। শেখ হাসিনাও নাম ধরে সরাসরি বলছেন— কে তাকে কাকে দিয়ে গ্রেনেড হামলায় হত্যা করতে চেয়েছিলেন ২১ আগস্ট! এ বিষয়ে তাদের শাসনামলেও মামলার নিষ্পত্তি কিন্তু হয়নি, এমনকি নিম্ন আদালতেও। তা সত্ত্বেও সরাসরি অভিযোগ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর। মনে হয়, প্রমাণ করতে না পারলেও তিনি ওটা বিশ্বাস করেন। কিংবা ঠিক বিশ্বাস না করলেও বলতে অসুবিধা কী?
এ রকম একটা পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচন এসে গেলে শান্তিপ্রিয় মানুষ তো উদ্বিগ্ন হবেই। বর্তমান শাসনামলে কিন্তু দেশের সিংহভাগ মানুষ খেয়ে-পরে আগের চেয়ে ভালো আছে। তারা তো এটাও ভাবছে, নির্বাচন নিয়ে সংঘাতটাই অনিবার্য হয়ে উঠলে বা যেনতেনভাবে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও অস্থিতিশীলতা চলতে থাকলে তাদের রুজি-রোজগার না ব্যাহত হয়! রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে ঢোকার মুখে তরল দুধ দিয়ে চা বিক্রি করেন, এমন একজন এ লেখককে বলেছেন— যে কোনো হরতালে তার সব রকম বিক্রি প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। গণতান্ত্রিক দেশ বলতে আমরা যা বুঝি, তার মালিকদের একজন কিন্তু ওই দোকানদার। তার ও তাদের কথা ভাবার ফুরসত্ কোথায় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে বিরোধে লিপ্ত দুই শাসক দলের? শুভবুদ্ধি মাথা ঠুকে মরছে তাদের বন্ধ দরজায়।
লেখক : সাংবাদিক
hmamun67@gmail.com