আসল ও
নকল
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৬
আত্মা আসল, প্রেতাত্মা নকল। আসল-নকলের ফারাক আত্মা আর প্রেতাত্মার উপর ভর করে নির্ণয় করা হলে বস্তুবাদীরা বোধকরি তা মানতে চাইবেন না। কারণ তারা সংশয়ী। তারা বিষম বিতর্কে বিপত্তি বাধাবে। অস্তিত্বের জন্যে তারা অস্থি চায়। আত্মা বা প্রেতাত্মা কারোরই অস্থি নেই। অবয়ব নেই। এরা অরূপ, অমূর্ত। মূর্তমান হতে হলে কায়া লাগে। কিন্তু প্রেতাত্মার কায়া নেই। ছায়া আছে। যার কায়া নেই, তার ছায়া কুহক। কায়াহীন ছায়ার নাম মায়া। যেমন মায়া-মরীচিকা। হয়তো এ যুক্ততেই বস্তুবাদীরা আত্মা-প্রেতাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ী। তবে তারা একথা মানতে নিশ্চয়ই নির্বিবাদী হবেন যে, নকল মানেই আসলের প্রেতাত্মা। যখন আসলের আত্মা হরণ করা হয় তখন তার মাঝে বিরাজ করে আত্মিক শূন্যতা। সে অন্তস্থ জীবনীশক্তি হারায়। হারায় অন্তর্গত গুণাগুণ। আসলের আসল অস্তিত্ব বিলীন হয় নকল প্রেতাত্মায়। তখন সে গুণাগুণে ভিন্ন। আসলের শুভ-সত্তা মরে ভূত হয়। সেই ভূতই প্রেতাত্মা। সেই প্রেতাত্মাই নকল। আসলকে বাঁধতে হয় নৈতিক বাঁধনে, আইনের শাসনে, যুগান্তরের চর্চায়, নিত্যদিনের অনুশীলনে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই যতো বিপত্তি। তখন আসলের সমার্থক, সতীর্থ, সহোদররা হয় সমাজচ্যুত,বিতাড়িত, উপেক্ষিত।
ফল আসল, ফরমালিন নকল। যেমন মানুষ আসল, মমি নকল। মাছ আমিষ, ফরমালিন বিষ। আসলের সাথে নকলের মিশেল-মিশ্রণ আসলের আত্মাকে হনন করে, হরণ করে। নকল নামের প্রেতাত্মা তখন দাপুটে হয়, দাপটে বেড়ায়। চিনির সঙ্গে নুন, দুধের সঙ্গে পানি, চালের সঙ্গে কাঁকর, আধুলির সাথে আনি, ঘিয়ের সাথে তেল, ডিজেলের সাথে কেরোসিন, লাভের সাথে লোভের মিশেল চলছে নির্বিচারে। তাছাড়া মাইনেতে উপরি, নীতিতে স্বজনপ্রীতি, প্রশংসায় চাটুকারিতা, কাব্যে যৌনতা, ফ্যাশনে নগ্নতার মিশেল চলছে নিত্যানন্দে। এভাবেই আসল বিলীন হয় নকলে। ভূতে। প্রেতাত্মায়। নকল আসলকে গ্রাস করে। রাহুগ্রাস রচনা করে রাহুচক্র। এ চক্র বক্রগতিতে ঘুরপাক খায় সমাজে। সমাজের আসল দেহ যকৃতকে বিকৃত করে। নকলের ধাওয়ায় আসল নাকাল। পালিয়ে বাঁচতে চায়। সমাজচ্যুত হয়ে ঘরকুণো হয়। Bad money drives good money out of circulation- Gresham’s Law —এর সেই প্রেতাত্মা সমাজের ঘাড়ে ভর করেছে। অবশ্য তত্ত্বটি টাকার মূল্যমান তারতম্যের নির্দেশক। অধিক মূল্যমানের মুদ্রা লুকিয়ে যায় লকারে। নিম্নমূল্যমানের মুদ্রা বাজার হাঁকিয়ে বেড়ায়। ছেঁড়া-ফাঁড়া টাকার নোটের ধাওয়ায়ও কচকচে নতুন নোটগুলো জায়গা করে নেয় টাকার থলেতে, ঘরের তালাবদ্ধ কুঠুরিতে, সিন্দুকে, বালিশের নিচে, মাটির ব্যাংকে, সঞ্চয়ীর সঞ্চয়ে, গোপন ড্রয়ারের নিভৃত কোণে, মানিব্যাগের ভিন্ন পরতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর ময়লা-মলিন, ছেঁড়া-ফাঁড়া নোটেরা বাজার দাপটে বেড়ায়। দুষ্টদের ধাওয়া খেয়ে শিষ্টরা যেমন সমাজচ্যুত হয়ে ঘরের কোণে ঠাঁই নেয়, নির্বিবাদ জীবন যাপনে তাদের সুখ-স্বস্তি খোঁজে। দুষ্ট-নষ্ট নকুলে দাপটে, নির্গুণ আস্ফাালনে, অনাচারে, ভাষণে, শাসনে সমাজে প্রভূত প্রভাব রাখে। লিমেরিকের আদলে বললে—
ময়লা মলিন টাকার নোটে বাজার থাকে ছাওয়া / কচকচাকচ নোটগুলোকে যায় না তেমন পাওয়া/ ছেঁড়া টাকার ধাওয়া খেয়ে/নতুন টাকা পালায় ধেয়ে/ দুষ্টলোকের ধাওয়ায় তেমন শিষ্টরা হয় হাওয়া।
লেখালেখি আসল; দেখাদেখি নকল। লেখালেখি রচনাদির কাজ। সৃজনশীলতার অনুশীলন। জনবিচ্ছিন্ন চর্চা। ‘তিনি লেখালেখি নিয়েই আছেন’ কিংবা ‘তিনি লেখালেখি করেন’ বলা মানেই এটা তাঁর আসল কাজ। পরীক্ষার হলে নকুলে ছাত্রের যে দেখাদেখি বা টোকাটুকি তা আসলের অনুকরণ। পন্থাটা অনৈতিক, বেআইনী। তাই তা নকল। সে কথা বাদ দিলেও অনুকরণ নিতান্তই নকল। এ যেন গড্ডালিকা প্রবাহ। অবোধ ভেড়ার পালের নিরুদ্দেশ পথচলা। মেষপাল অগ্র-পশ্চাত্ ভাবে না। হেতু খোঁজে না। অগ্রবর্তী মেষের অনুকরণে অনুগামী হয়। অন্ধের মতো এই অনুকরণীয় পথচলা মেষপালের গড্ডালিকা প্রবাহ। গন্তব্য জানা নেই। চলার কারণ এদের ভাবায় না। যেন অগস্ত্য যাত্রা।
কর্মজীবী আসল, ভিক্ষাজীবী নকল। হাত আসল। অজুহাত নকল। যে হাত, সে হাত আসল। কর্মে নিষ্ঠ বলেই তা আসল। ভিক্ষের জন্যে পাতা হাত আসল হাত নয়। হাতিয়ে নেবার হাত আরো নকল। ভালো কাজে হাত লাগাবার অভ্যেস করলেই কল্যাণ বিধানের কাজে হাত আসে। পিঠে হাত বুলানোর মাধ্যমে মমতা আর সমবেদনায় আপ্লুত করা যায়। হাত ওঠানোর চেয়ে হাত বুলানো বেশি ফলদায়ক। হাত কচলানো দীনতার লক্ষণ। ব্যক্তিত্বহীন মিনতির পরিচায়ক। হাতজোড় করার মতোই নিজেকে ছোট করা। আর অজুহাত? এ হাত ওজরের। ছুতার বাহানার। তাই তা নকল। আসল হাত কাজের হাতে বাজ পড়ে। ডান হাত, বাম হাত গুটিয়ে রাখলে যে তৃতীয় হাতের দাপট বাড়ে— সে হাতের নাম অজুহাত। এ হাত পৃথিবীর সব দেশেই সমভাবে দেখা যায় না। শুধু আমাদের দেশেই এ হাতের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে অবলীলায়। আবার আরেক হাত আছে— নেয়ার হাত। নেয়ার হাত, পাতা হাত। তাই নিচে থাকে। দেয়ার হাত উপরে থাকে। আমরা নিচে থাকা হাত চাই না— চাই উপরে থাকার হাত— দেবার হাত।
রাজনীতিবিদ আসল, রাজনীতিজীবী নকল। রাজনীতিক নীতি-নৈতিকতার ধারণ নীতির চর্চা, আদর্শের অনুশীলন, মতবাদের প্রতিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ। রাজনীতিবেত্তা বলেই তিনিই রাজনীতিবিদ। ভাষাবিদ যেমন ভাষাপন্ডিত, রাজনীতিবিদ তেমন রাজনীতিজ্ঞ, রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বিদগ্ধ, বিদ্বজ্জন।
লেখক :গবেষক