[ রা জ নী তি ]

বিপর্যস্ত সমাজ—রুখে দাঁড়াও নতুন প্রজন্ম

বাঙালি জাতি গর্বিত জাতি, যুদ্ধ করে তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা ‘মা’কে মুক্ত করার জাতি, এ জাতি পারে বুকের রক্ত আর সম্ভ্রম দিয়ে দেশকে স্বাধীন করতে, এ জাতি জানে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়তে, এ জাতি জানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, এ জাতি জানে দুর্নীতিবাজ একনায়কদের মসনদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে, এ জাতি জানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হতে। এ জাতি পারে বিশ্বমানের ক্রিকেট খেলতে, আমরা পারি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে, আমরা পারি হিমালয় জয় করতে। আমাদের সন্তানেরা যে কারো সাথে লড়তে পারে সমানে সমান। আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জাতি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জাতি। এ জাতি পৃথিবীর কোন জাতি থেকে কম নয়। আজকে ভাববার সময় এসেছে, এত গুণে গুণাম্বিত এই বাঙালি জাতি বার বার কেন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ে? কেন আমরা পারছি না আমাদের সোনার সন্তানদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে? কেন পারি না খাদ্যে ভেজালকারীদের দুই হাত ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে? হাজার কোটি টাকার ভেজাল ওষুধ ব্যবসায়ীদের নির্মূল করতে? কেন পারি না রাজনৈতিক মোড়কে আবৃত নর পিশাচ GOD FATHER ও তাদের অধীনস্থ সন্ত্রাসীদের বিষাক্ত কালো হাত পিষে ফেলতে? কেন পারি না বাংলার সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিচার করতে? আজকাল প্রায়ই TV Talk Show ও সেমিনারে শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, হঠাত্ উদিত রাজনীতিবিদদের অধিকাংশেরই এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এরা এক এক দলের ও পক্ষের অনুসারি। এদের মুখ কথা বলে না, পকেট কথা বলে। পকেট যত ভারি, মুখে তত ফুলঝুরি। এরা প্রভুদের কথা ময়না পাখির মত বলতে থাকে। প্রভু যদি বলে সকালকে রাত, এরা তাই বলে। এরা পারে না সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে। এরা সমাজের উচ্চস্তরের মেরুদণ্ডহীন অপশক্তি। কালো বিড়াল। এ জাতি কেন বার বার এদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকবে, এ জাতি কেন এদের মিথ্যা প্রচারে প্রভাবিত হবে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আজকাল প্রায় আমাদের অনেকে বলে, বাঙালির কিছু হবে না, এ দেশের কিছু হবে না। এদের কাছে অনুরোধ এই নেতিবাচক কথা বলবেন না এবং এই মনোভাব থেকে বের হয়ে আসেন। যে নিজেকে গালি দেয়, নিজের দেশকে গালি দেয়, সে তার নিজের স্বত্বা/অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে। মনে রাখতে হবে আমরা বীরের জাতি, আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে সব বাধা দূর করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমরা প্রায়ই আমাদের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বিষোদগার করি। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দলমত নির্বিশেষে রাজনীতিবিদদের একটি অংশ বহু কুকর্মের নায়ক। তবে ভুল করবেন না। এদের সিংহভাগই প্রকৃত রাজনীতিবিদ নয়। এরা দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চোরাকারবারী, সমাজে মূল্যহীন, পরিচয়হীন সুযোগ সন্ধানী। টাকার জোরে এরা বিভিন্ন দলে স্থান করে নেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে রাজনীতি রাজনীতিবিদরাই করবে। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা এই সমাজের, এই দেশেরই সন্তান। আমাদের ভুললে চলবে না যে, আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য আছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ৪৭-এ দেশ ভাগ, ৭০-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১- এ স্বাধীনতা যুদ্ধ, এ সবই রাজনৈতিক সফল নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই এসেছে। আমাদের যেটা প্রয়োজন তা হলো আমরা রাজনীতিবিদদের দ্বারা পরিচালিত হব না। আমাদের দ্বারা রাজনীতিবিদরা পরিচালিত হবে। জনগণের জন্য সরকার, সরকারের জন্য জনগণ নয়। সংসদে সরকার ও বিরোধীদলের পক্ষে একজন ‘WHIP’ নিয়োগ করা হয়, ‘WHIP’ অর্থ চাবুক। এদের দায়িত্ব ভদ্র ভাষায় চাবুক মেরে সাংসদদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এখন জনগণের সময় এসেছে রাজনীতিবিদদের ‘WHIP’ এর ভূমিকা পালন করার রাজনীতি বা রাজনীতিবিদরা যদি লাইনচ্যুত হয়, এই সমাজ তথা জনগণের দায়িত্ব হবে তাদেরকে আবারো লাইন -এর উপর তুলে দিতে। আজকে শুধু রাজনীতি বা রাজনীতিবিদরাই কলুষিত হচ্ছে না, এই সমাজের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই কলুষিত হয়ে উঠছে। আমাদের অধিকাংশই লুটপাটে ব্যস্ত। আমরা অনৈতিকভাবে উপার্জিত অর্থ সুন্দরভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে যখন ঘরে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে যাই তখন সমালোচনার টার্গেট হয় সরকারি বেসরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা। সমালোচনা অবশ্যই করবো, করতে হবে। তবে সমালোচনার আগে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমালোচনা যেদিন করতে শিখবো, সেদিন আমরা সুন্দর দেশ উপহার দিতে পারবো। কথায় আছে, চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। তাই জনগণকে শুধু রাজনীতিবিদদের “WHIP” নয়, রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আমরা যারা দেশের সম্পদ লুণ্ঠনে ব্যস্ত তাদেরও “WHIP” এর দায়িত্ব নিতে হবে। অনেকের কাছে হয়তো মনে হবে একি সম্ভব! আমি বলবো অবশ্যই সম্ভব। যে শক্তি নিয়ে ৭১-এ এদেশের নারী-পুরুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করেছে, সেই শক্তি আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারলেই আমরা জাতি হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমাদেরকে রাজনীতিবিদ তৈরির কারখানা পুনঃস্থাপন করতে হবে। ছাত্র জীবনেই একজন মানুষ সবচেয়ে সাহসী ও নির্মল মনের হয়। আজকের ছাত্র নেতাদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের সফল নেতৃত্ব উঠে আসবে। কিন্তু বিগত তিন দশক ধরে যা দেখেছি, সেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন যথাযথ সময়ে না হওয়া বা একেবারেই না হওয়া, দলীয় ছাত্র সংগঠনের নির্বাচনে জনপ্রিয় ছাত্র নেতারা নির্বাচিত না হওয়া (কারণ জনপ্রিয় ছাত্রনেতারা নেতাদের “খয়ের খা” হয় না)। এর কারণে সঠিক নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে নাই। অর্থের জোরে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং “Yes Boss” মনোভাবের কারণে আজকে “উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকজন” রাজনীতির মূল চালিকা শক্তিকে প্রভাবিত করছে। আজকে শুনে অবাক হই যে, রাজনৈতিক দলের ছাত্র বা যুব সংগঠনের পদ পদবি পাওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এর জন্য এখনই রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজন। যে দলই ক্ষমতায় আসে এসবের কোন পরিবর্তন হয় না। এসব নিয়ে কেউ কথা বলে না। গোড়ার পচন না ঠিক করে আগা পরিষ্কারে আমরা ব্যস্ত। আজকে একজন এম,এল,এস,এস -এর চাকরি থেকে শুরু করে উচ্চতর পদ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পদের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু বলছিল সবচেয়ে Corrupted হলো পুলিশ। আমি বল্লাম, আমার চার আঙ্গুলে যদি পচন ধরে, তাহলে পঞ্চম আঙ্গুলের কি দোষ। একজন S.I. বা AS.I. এর যোগ্যতা থাকা সত্বেও চাকরি পেতে যদি ভিটামাটি বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়, তাহলে তার কি দোষ। কর্মজীবনের প্রথম প্রহরেই যদি এই কাজটা করতে হয় তাহলে তারা দায়ী হতে পারে না। আমাদেরকে এর পরিবর্তন করতে হবে। অনেক সরকারি আধা সরকারি কর্মকর্তাদের দেখি বিদেশে দামী হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে চিকিত্সা করে ফিরে আসে। ক্ষমতার পালাবদলে মন্ত্রী, এমপি তথা রাজনীতিবিদরা জেলে যায়। কিন্তু এদের দু’একজন বাদে কারো কিছু হয়েছে বলে নজির দেখি না। এরা বিভিন্ন সিন্ডিকেট দ্বারা পরিচালিত। সিন্ডিকেটের পক্ষে কাজ করার জন্য এরা Speed Money পায় এবং Health Insurance হিসেবে তাদের চিকিত্সা ব্যয় সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে বহন করা হয়। জনগণ একাট্টা হলে এসব বন্ধ করা শুধু সময়ের ব্যাপার। ১/১১-এর সেনা সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার আমাদের কারো কাম্য নয়। সেই সময় ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা প্রতিহিংসার স্বীকার হয়েছিল। তবে আমরা জানি, বিভিন্ন দূষণের কারণে যেমন প্রকৃতি বিরূপ হয় এবং যার প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, ঠিক তেমনই রাজনীতি যখন ব্যর্থ হয়, অর্থনীতি যখন ব্যর্থ হয়, তখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামরিক শাসন আসে। যেহেতু তারা রাজনীতিবিদ নয় এবং যেহেতু তারা আমাদের সমাজেরই অঙ্গ সেহেতু তারাও কোন স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। আমি আবারও বলবো রাজনীতি ও সরকার সত্যিকারের রাজনীতিবিদদের দ্বারাই পরিচালিত হতে হবে। অন্য কারো দ্বারা নয়। তবে রাজনীতির ব্যর্থতার জন্যই ১/১১ এর মত বিস্ফোরণ হয়েছিল এবং ভবিষ্যতেও হবে যদি ২০০৬-এর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যদিও সুষ্ঠু ভোটার লিষ্ট ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রক্রিয়ায় তাদের যথেষ্ট অবদান আছে। একটা দুঃখের কথা না বললেই নয়, ভেবেছিলাম ১/১১ এর ঝাঁকুনিতে সবার একটু শিক্ষা হবে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখতে পাইনি। যেই সুযোগ পায় সেই লুণ্ঠনে ব্যস্ত হয়ে যায়। তাই আজকের প্রজন্মের কাছে আমার সনির্বন্ধ আকুতি, তোমরা বের হয়ে আসো, দেহ মন জাগ্রত করো এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে। এর জন্য কোন রাজনৈতিক দল করার প্রয়োজন নাই। এ দেশকে বাঁচাতে হলে, এদেশের মানুষকে সুখী-সমৃদ্ধ দেখতে হলে, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর মুক্ত দেশ গড়তে হলে তোমাদের প্রয়োজন। এর জন্য যার যার অবস্থান থেকে যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে আমরা মাস্তান, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারবো। নিজের কাজের পাশাপাশি একটু সময় দিলেই আমরা আমাদের সোনার বাংলাকে রক্ষা করতে পারবো। যারা এদেশের জন্য শহীদ হয়েছেন, আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা ঋণমুক্ত হতে পারবো। পৃথিবীর মানচিত্রে আমরা গর্বিত জাতি হয়ে বাঁচতে পারবো। আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর ভবিষ্যত্ তৈরি করতে পারবো। আজকের প্রজন্মকে বলি, নিজের বিবেকের কাছে একবার প্রশ্ন করে দেখ, তোমার অন্তর কি বলে? অন্তর যদি বলে এদেশের সন্তান হিসেবে, একজন সুনাগরিক হিসেবে তোমাদের দায়িত্ব মাতৃভূমিকে কালিমামুক্ত করা, তাহলে বের হয়ে আসো, রুখে দাঁড়াও, বদলে দাও এদেশকে। লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক