তাহারা কেন চাঁদাবাজ হইল

চাঁদা দিতে গড়িমসি করায় দরিদ্র চা বিক্রেতা জাহাঙ্গির হোসেনের শরীরে গরম পানি ঢালিয়া দিয়াছেন স্থানীয় এক যুব নেতা। এই অমানুষিক ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত রবিবার জনাকীর্ণ গুলিস্তান এলাকায়। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের সামনে একটি টং ঘরে চা দোকান করেন জাহাঙ্গির হোসেন। এইজন্য তাহাকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় দেড়শত টাকা। তাহার দশদিনের চাঁদা পনেরশত টাকা বাকি পড়িয়া ছিল। সেই বকেয়া চাঁদা পরিশোধ করিতে না পারায় প্রচণ্ড ক্ষেপিয়া যান স্থানীয় ওই নেতা। আর তেলে বেগুনে তিনি জ্বলিয়া উঠিবেনই বা না কেন। গরীব চা বিক্রেতা যাহার নুন আনিতে পান্তা ফুরায়, তাহারই কিনা এত বড় স্পর্ধা যে মুখের ওপর তর্ক করে। অপিচ অকুলিন চা-ওয়ালা তর্ক জুড়িয়া দিয়াছিল স্থানীয় ওই নেতার সঙ্গে। অতঃপর কতধানে কত চাউল তাহাই দেখাইয়া দেওয়া হইয়াছে। সে তাহার আস্পর্ধার উচিত শিক্ষা পাইয়াছে। তাহার কি জানা উচিত ছিল না যে, চাঁদাজীবী ও পেশীজীবী নেতা নামধারী স্থানীয়গণের নিকট ধরাখানি সরা হইয়া গিয়াছে অনেক আগেই। তাহা না জানিবার না বুঝিবার সাক্ষাত্ ফল পাইয়াছেন জাহাঙ্গির হোসেন। ফুটন্ত পানিতে ঝলসানো শরীরে তিনি এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। পক্ষান্তরে লোকারণ্যে হেন কর্ম সম্পাদন করিয়া নেতা, নাকি পাতি নেতাটি চলিয়া গিয়াছেন নির্বিঘ্নে। এই তো হয়, এই তো চলিয়া আসিয়াছে আমাদের এই স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে। ফুটপাতে কিংবা শপিংমলের সামনে, যত্রতত্র দোকানপাট লইয়া বসা বেআইনী। ইহা কমবেশি সকলেরই জানা। কিন্তু যাহারা দৈনিক বা মাসিক চাঁদা নিয়া দোকান করিতে দেন,তাহারা কোন আইনে সেই অধিকার লাভ করিয়াছেন, সে এক বিরাট প্রশ্ন বটে! এ কথাও সত্য যে, পাড়ায়- মহল্লায়, ফুটপাতে, এইখানে সেইখানে যাহারা তোলা উঠান তাহারা এই সমাজের রাঘব বোয়াল নহেন। ধনে-মানে তাহারা বিরাট কিছু নহেন। খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাইবে ওই চাঁদাবাজরাও গরীব: ছিঁচকে গুন্ডা। চাকরি-বাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অন্যকোনো শ্রমসাধ্য কাজ করিয়া জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা না করিয়া তাহারা চাঁদাবাজি মাস্তানি- তাফালিংয়ের পথ বাছিয়া লইয়াছে। প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, তাহারা এইরূপ অন্যায় পথে পা বাড়াইবার সাহস বা প্রেরণা পায় কোথা হইতে? যে সমাজে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি অনায়াসে চলিতে পারে, ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় বহু সহস্র কোটি টাকা বাহির করিয়া নেওয়া যাইতে পারে সেই সমাজে একজন সাধারণ মানুষ , যাহার আয়-রোজগারের ভাল কোনো পথও নাই, চাঁদাবাজি করিতে সে কেন বিচলিত বোধ করিবে? পানি যেমন উপর হইতে নিচে গড়ায় সমাজের মানুষের বোধ-বিবেচনাও তেমনই উপর হইতে নিচে প্রবাহিত হয়। চাঁদাবাজির পেছনে আরও নানান কারণ রহিয়াছে। পত্রিকায় প্রায়শ খবর প্রকাশিত হইতে দেখা যায় যে, চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে ঠিকাদার কাজ করিতে পারিতেছে না। এইরূপ ক্ষেত্রে চাঁদাবাজরা হয় তো ভাবে যে, ঠিকাদার কাজে নয়ছয় করিবে এমন কি কাজ না তুলিয়াই বিল তুলিয়া লইবে। তাহা হইলে চাঁদা দিবে না কেন! ঠিকাদার যদি মারিয়া খাইতে পারে তাহা হইলে সামান্য ভাগ কেন স্থানীয় বেকার হাফবেকার নেতাগোছের ষন্ডাগুন্ডারা পাইবে না? এইভাবেই অন্যায় অনাচার ও জুলুমের প্রসার ঘটিয়া চলিয়াছে। আর ইহা যখন সর্বব্যাপী হইয়া যায় তখন জাহাঙ্গিরের মত হতদরিদ্র চাওয়ালাও রেহাই পায় না। গত রবিবারের ঘটনা সেই সাক্ষ্যই বহন করে। দেশে-সমাজে নিয়মনীতি এবং আইন কানুন সুপ্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া এই অবস্থা হইতে বাহির হইয়া আসিবার সহজ কোনো পথ আছে বলিয়া মনে হয় না।