নিরাপদ ট্রেন যাত্রা
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৬
ট্রেন হইতে ফেলিয়া দিয়া যাত্রী হত্যার ঘটনা বাড়িয়া চলিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। কিছুদিন আগে পুলিশ গাজীপুর সদর ও কালিয়াকৈর উপজেলার জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের পার্শ্ব হইতে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করিয়াছে। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হইয়াছে আরো একজনকে। আহত ব্যক্তির জবানবন্দি অনুযায়ী ডাকাতির সময় বাধা দেওয়ায় ঐ চারজনকে গভীর রাত্রে ট্রেনের ছাদ হইতে ফেলিয়া হত্যা করা হইয়াছে। শুধু ট্রেনের ছাদ হইতেই নহে, অনেক সময় বগিতে ঢুকিয়াও ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করিয়া সর্বস্ব কাড়িয়া নেয়। বাধা দিলে হত্যার চেষ্টা করে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১২ সালের ৮ জুলাই হইতে ৯ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র এক মাসেই ঢাকা রেলওয়ে থানাধীন রেললাইনের পার্শ্ব হইতে ৫২টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটে গাজীপুর জেলার আওতাধীন রেললাইনের পার্শ্বে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, গত বত্সর সারা দেশের রেললাইন ও আশেপাশের এলাকা হইতে মোট ৮৭৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। ইহার সবই যে হত্যাকাণ্ড তাহা সত্য নহে। ইহার মধ্যে ট্রেনে কাটা পড়িয়া, ট্রেনে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া ও ট্রেনের ছাদে যাতায়াতের সময় ব্রিজ বা অন্য কিছুতে ধাক্কা খাইয়া মৃত্যুর ঘটনাও আছে। তবে ট্রেনে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের ঘটনাও কম ঘটিতেছে না।
জিআরপি বা রেলওয়ে পুলিশ এসব অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডকে স্রেফ দুর্ঘটনা বলিয়া চালাইয়া দেয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। যাহারা ট্রেনের ছাদে চলাচলের কারণে ডাকাতদের হাতে নিহত হয়, তাহাদের বেশিরভাগই গরীব ও শ্রমজীবী মানুষ। একে তো ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ নিষিদ্ধ। তাহার ওপর তাহারা হতদিরদ্র হওয়ায় তাহাদের অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর তেমন তদন্ত হয় না। অনেক সময় জটিলতা এড়াইতে দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যার কথাও বলা হয়। ফলে বেশির ভাগ ঘটনাই অনুদঘাটিত থাকিয়া যায়। ট্রেনে যাত্রীদের হত্যা যে বন্ধ হইতেছে না তাহার অন্যতম প্রধান কারণ হইতেছে এই উদাসীনতা। তাই চলন্ত ট্রেনে সার্বিকভাবে যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়াইতে হইবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাত্র কয়েকজন পুলিশ চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব পালন করেন। তাহারা সামনের বা পিছনের বগিতে থাকিয়া বেশিরভাগ সময় গল্পগুজব করিয়া সময় কাটান এমন অভিযোগও করা হইয়া থাকে। ফলে পার্শ্বের বগিতে কী ঘটিতেছে তাহাও তাহারা জানিতে পারেন না বা জানিলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। অথবা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষমতাই রাখেন না। আমরা মনে করি, শত শত যাত্রীর বিবেচনায় চলন্ত ট্রেনে হাতেগোনা কয়েকজন পুলিশের নিযুক্তি যথেষ্ট নহে। ট্রেনে পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীর সংখা বৃদ্ধি করিতে হইবে। তাহাদের উন্নতমানের ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দিতে হইবে। অন্যদিকে বিশেষ কোন উত্সব ব্যতীত ট্রেনের ছাদে যাহাতে কেহ ভ্রমণ করিতে না পারে, সেদিকে নজর দিতে হইবে। যাহারা ট্রেনের ছাদে যাতায়াত করে, তাহারা যে কোন স্টেশন হইতেই ওঠে। সেসময় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। হতদরিদ্রদের ট্রেন যাত্রায় বিশেষ কোন উদ্যোগ নেওয়া যায় কিনা তাহাও ভাবা যাইতে পারে। কিন্তু ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে।
পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী গাজীপুর সদরের মীরেরগাঁও, কালিয়াকৈর থানাধীন পূর্ব চান্দরা বা চন্দ্রা, জয়দেবপুর স্টেশন হইতে মৌচাক পর্যন্ত ও তুরাগ সেতুর উপরে উপরোক্ত হত্যাকাণ্ড বেশি ঘটিতেছে। কারণ এসব এলাকা নিরব ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ। অতএব, এসব এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করিতে হইবে। অন্যদিকে রাজধানীর দক্ষিণখান ও উত্তরখান এলাকার কিছু দুর্বৃত্ত চক্রই এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটাইতেছে। সুতরাং দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহাছাড়া জিআরপি পুলিশ রেলমন্ত্রণালয়ের নহে, বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। এই দ্বৈততার কারণে বা সমন্বয়ের অভাবে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি বরাবরই অবহেলিত ও উপেক্ষিত থাকিয়া যাইতেছে। এ ব্যাপারেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়া দেখিতে হইবে এবং জিআরপি পুলিশের উন্নতি বিধানে সচেষ্ট হইতে হইবে।