এ সমস্যার সমাধান করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৭
৭০-এর নির্বাচনে প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। ঐ নির্বাচনের পর সারাদেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে একটা বিশাল দূরত্ব বিরাজমান তার প্রধান কারণ একটি। সেটা হল বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর বিশাল নেতৃত্ব ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে মতানৈক্য। প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ব্যাপারটি আলোচনা করা যাক। শুধু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, চীন, আমেরিকা নয় সমস্ত বিশ্বই জানে যে বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন। এখানে নেতৃত্বের ব্যাপারে তার পাশে কাউকেও দাঁড় করানো যায় না, সম্ভব নয়। এমন কি মাওলানা ভাসানীকেও নেতৃত্বের অংশীদার করা যায় না। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ যে মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়া পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে তার নজির বিশ্বে কোন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বে দেখা যায় না। বিশ্ববাসী জানে যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাত ১২টায় যখন পাকিস্তান বাহিনী বাঙালিদের আক্রমণ করে ঐ রাত ১২টায়ই রাজারবাগ পুলিশ, ছাত্র জনতা, প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। অর্থাত্ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৫ মার্চ রাত ১২টায়।
অপর পক্ষে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র দাবী ও অনুরোধে জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। আবার বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ, বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর পাকিস্তান বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের নির্দেশাবলী অনুসারে ও বঙ্গবন্ধুকে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর স্বাধীনতা ঘোষণার অনুসারে মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেও বিশ্ব জনমত তাদের পক্ষে এনে ৯ মাস যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করে। বঙ্গবন্ধু অনুগামী এ নেতৃবৃন্দ হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোস্তাক আহমেদ। তাজউদ্দিন আহমেদের সরকার তথা মুজিবনগর সরকার কর্নেল ওসমানিকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক বানিয়ে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করেন। এই ১১ জন সেক্টর কমান্ডার শেখ মুজিবুরের অনুগামী লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের দিক-নির্দেশনা দিয়ে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১১ জন সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে জিয়াউর রহমানও একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী কাদেরিয়া বাহিনী বানিয়ে বিশ্বে আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচিত হন। মেজর জলিলের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের কথা আমরা বিবিসির মাধ্যমে শুনেছি। কর্নেল ওসমানীর বেতার ভাষণ শুনেছি। যা হোক সবার কথা এখানে লিখতে গেলে এখানে লেখা শেষ হবে না। কিন্তু সমস্যা হল বিএনপি হিমালয় সম নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর পাশে জিয়াউর রহমানকে বসিয়ে দিতে চায়। মুসলিম লীগ নেতা সবুর খান বলছিলেন শেখ মুজিব যদি হিমালয় হয় তাহলে জিয়াউর রহমানকে একটি টিলা বলা যায়। এখন প্রশ্ন হল জিয়াউর রহমানকে যদি বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী ব্যক্তি বলি তাহলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মুনছুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, বঙ্গবীর ওসমানীকে আমরা কোথায় বসাবো। আর জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী ব্যক্তি হিসাবে বসাবেই বা কেন? ইতিহাস কি বলে? ইতিহাস তো আর গল্প নয় যে, যেমন খুশী গল্প একটা বলে দিলেই হল। এখন দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসলে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করে, খাটো করে দেখানো হয়, আর গায়ের জোরে জিয়াউর রহমানকে টেনেটুনে বড় করার চেষ্টা করা হয়। অপর পক্ষে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বঙ্গবন্ধুর সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমানের যে ভূমিকা ছিল তা অস্বীকার করা হয়। এই সমস্যার সমাধান জাতীয়ভাবে দেশের সমস্ত জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের ও ঐতিহাসিকদের যৌথ প্রচেষ্টায় সমাধান করতে হবে। অন্যথায়, দেশে অশান্তি চিরদিন লেগে থাকবে। কেননা বিএনপি তো ছোট দল নয়। তারা তো জিয়াকে টেনেটুনে বড় করে দেখানোর পক্ষে। অপর পক্ষে তারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তারা বিকৃত ইতিহাস পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক পুস্তক-পুস্তিকায় দেশের সঠিক ইতিহাস চলমান রাখতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে পাঠ্য-পুস্তকে বর্তমান সঠিক ইতিহাস পাল্টিয়ে বিকৃত ইতিহাস চালু করতে যাতে না পারে সে ব্যাপারে দেশের জ্ঞানী-গুণী, সুশীল সমাজকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ করেছে শেখ মুজিবের লক্ষ লক্ষ অনুগামীরা, জিয়াউর রহমানের কোন অনুগামী ছিল না। তিনি কোন নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন চাকরিজীবী। তিনি ছিলেন অজানা জনৈক ব্যক্তি। ’৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর চেতনা মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ছিল। ’৭৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কেউ জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের একজন নেতা বলেনি। আমি বাংলাদেশের সুশীল সমাজকে ও সমস্ত জ্ঞানী-গুণীদের প্রশ্ন করি আপনারা কি বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী ব্যক্তি হিসাবে জিয়াউর রহমানের নাম লিখতে চান? আপনাদের এই ব্যাপারটার সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে। আপনারা সবাই আওয়ামী লীগ এ বিএনপি’র মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছাতে বলেন, তবে আপনারাই স্পষ্ট করে বলে দিন যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার একক নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
লেখক :সাবেক ছাত্রনেতা ও ব্যাংকার