রাজনীতি
দুই নেত্রীর প্রতি
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৭
দেশের দুইজন নারী নেত্রী দুইটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ায় তারা দুইজনই পাঁচ বছর মেয়াদী সরকারের দুইটি করে টার্ম পূরণ করে প্রত্যেকে দশ বছর দেশ শাসনের কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। দেশের মানুষ এখন তাদের দুইটি দলের ছায়াতলেই একত্রিত। ফলস্বরূপ বর্তমানে এই দল দুইটি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। মাঝে নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বছর দুয়েকের জন্য সেনা সমর্থিত সরকার দেশ চালিয়ে আলোচিত সমালোচিত হয়ে নির্বাচন দিয়ে সরে গিয়েছিল। আর সে নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়েছিল। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতেই শেষ হয়ে যাবে। এ অবস্থায় সামনের কয়েক মাসের মধ্যেই একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু ইতিমধ্যেই তা নিয়ে ভীষণ জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বলা বাহুল্য, যে জটিলতার জন্য এক এগারোর সৃষ্টি হয়েছিল, বর্তমান জটিলতা তার চেয়েও বেশি। সে সময় উভয় দলের সেক্রেটারী সাহেবরা যখন সংসদ ভবনে বসে আলোচনা করছিলেন আমি তখন সেখানে দাঁড়িয়ে চ্যানেল আই-এর এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলাম যে, তাদের আলোচনা সফল হবে না, কারণ আলোচনায় তারা মোটেও স্বাধীন নয়। আমি আরো বলেছিলাম এ আলোচনা অলরেডী ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে, এখন যা চলছে তা লোক দেখানো। আমার সে সাক্ষাত্কার দুইদিন ধরে প্রচারিত হয়েছিল। কথাটি আমি বলেছিলাম কারণ আমি জানতাম দুই নেত্রীর ইশারা ইঙ্গিত ছাড়া কিছুই হবে না। আর এও জানতাম যে, দুই নেত্রীর কেউ কাউকে ছাড় দিবেন না। ফলে যা হবার তাই হবে, আলোচনা ব্যর্থ হবে। এবারে দুই নেত্রীর মানসিক অবস্থান আরো বেশি প্রতিকূলে। প্রায় পঞ্চাশ বছর যাবত্ আমি সচেতনভাবে রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে যা দেখতে, জানতে এবং বুঝতে পেরেছি এবং পরছি তাতে এক্ষণে জাতির ভাগ্য দুর্যোগের কালো মেঘে ঢাকা। দুর্যোগের ঝড়-ঝাপটার বড় আঘাত জাতির ঘাড়ে যে কোন মুহূর্তে আছড়ে পড়তে পারে। দেশের ব্যাংক, ব্যবসা সবকিছুতে এমনিতেই অশনিসংকেত! এই মুহূর্তে পূঁজিবাজারের ধস অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির বারোটা বাজা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। অথচ দুই নেত্রীই এসব বিষয়ে নির্বিকার। তারা মনে করছেন তাদের নিজেদের ধ্যান-ধারণাই ঠিক। এক্ষেত্রে জনগণ বা ব্যবসায়ীগণ কি চান তা কেউই বুঝতে চাচ্ছেন না। তারা কেবলমাত্র নিজেদের চিন্তা চেতনাই জনগণের উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। দলের হাইকমান্ড বলতে যেহেতু তারা নিজেরাই এবং একথা প্রায় বলাই চলে যে, তারা কেউ অন্যের কথার তোয়াক্কা করেন না, তাই নিজেরা যা করেন বা বলেন সেটাই দলের কাজ বা কথা হয়ে যায়। কারণ তাদের কোন দলেই গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। ফলে দেশে গণতন্ত্র তথা জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটি দুই নেত্রীর জেদাজেদীর রণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে! এখন কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান। এসব দেখে-শুনে বিশ্ব বেহায়া খ্যাত এক ব্যক্তি বলেছেন দেশের মানুষ নারী নেত্রীর শাসন চায় না। যাক সে কথা। কিন্তু দুইজন নারী নেত্রী যে নিজেদের প্রতিই সুবিচার করছেন, তাও বলা চলে না। মানুষের চাওয়া-পাওয়ারও শেষ থাকে। সে হিসেবে দুই নেত্রী অনেক পেয়েছেন। দুইবার করে পূর্ণ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীত্ব করেছেন। আইন এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে সুযোগ পেলে আবারও করবেন। কিন্তু তাই বলে দেশের মানুষকে জিম্মি করে নয়। ক্ষমতার মোহে দেশটাকে ধ্বংস হতে দেয়া কারো কাম্য হতে পারে না। সামনে কি হতে যাচ্ছে তাও ভেবে দেখা দরকার। সমঝোতা ছাড়া নির্বাচন হলে নির্বাচনের দিনসহ তার আগে-পরে কি হবে সেকথাও ভাবতে হবে। আমি আজ এই লেখাটির মাধ্যমে উভয় নেত্রীকে পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই যে, আপনারা একটা সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হলে কারো জন্যই তা সুখকর হবে না। আশা করি, কি বলতে চেয়েছি তা বুঝতে পেরেছেন। এ অবস্থায় দুই নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানাব, আবেদন জানাব, আপনারা যার যার অনড় অবস্থান হতে সরে আসুন। দেশের মানুষের কথা ভেবে, দেশের ভবিষ্যত্ ভেবে একটি সমঝোতায় আসুন। দেশের মানুষ আপনাদের অনেক দিয়েছে, দুই দুইবার করে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। এবার আপনাদের পালা। আপনারা ত্যাগের মনোভাব নিয়ে পরস্পরের প্রতি এগিয়ে আসুন। ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে জনগণের পক্ষ হতে অনুরোধ জানাই, দেশ ও জাতিকে ভাল একটা কিছু উপহার দিন। প্লিজ!
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট