শুভ বিজয়া দশমী
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩৯
আজ শারদীয় দুর্গোত্সবের শেষ দিন, শুভ বিজয়া দশমী। মা দুর্গা আজ বিদায় বিসর্জনে যাইবেন। বিসর্জনের দিনটিতে একদিকে বিদায়ের শোক ও বেদনা, অন্যদিকে দুর্গতিনাশিনী ও কল্যাণময়ী মা যে এবারও পিতৃগৃহে আসিয়াছিলেন সেই আনন্দের রেশ বিদ্যমান থাকিবে। অবশ্য মমতাময়ী মায়ের বিসর্জন রূপক স্বরূপ। পাঁচ দিনের পূজা শেষে তিনি আমাদের অন্তর মন্দিরে চলিয়া যান। সেখানে নিত্য বিরাজ করেন। আশ্বিন বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে শরত্কালে এই পূজা করা হয় বলিয়া ইহা শারদীয় দুর্গাপূজা হিসাবেও সমধিক প্রচলিত। এই পূজায় হিন্দুদের সকল বর্ণের লোকেরাই অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন। তাই ইহাকে সার্বজনীন পূজাও বলা হয়।
দুর্গাপূজা মূলত বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান পূজা ও ধর্মীয় উত্সব। উপ-মহাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কালীপূজার ব্যাপ্তিই সর্বাধিক। প্রতি বত্সর দুর্গাপূজার পরই অমাবস্যা তিথিতে আসে এই পূজা। যাহা হউক, দুর্গা হইতেছেন শক্তির প্রতীক। দুর্গ বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করেন অথবা জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলিয়া তাহাকে বলা হয় দুর্গা। তিনি হিংসা, নাশকতা ও সকল অন্যায়-অপকর্মের প্রতীক সেই অসুরের নিধন সাধন করিয়া মানব সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্বস্তি আনয়ন করেন। মানুষকে দীক্ষিত করেন অভয়মন্ত্রে। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজপুঞ্জ হইতে তাঁহার জন্ম। তাই তিনি এতটা শক্তিময়ী। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী মা দুর্গা দেবাদিদেব মহাদেবের পত্নী। তাহাদের দুই কন্যা ও দুই পুত্র। লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক। এই চার সন্তানের সঙ্গে দুর্গার মহাশক্তির চারবর্গ তথা ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ সংশ্লিষ্ট। মহাদেবের বাসগৃহ কৈলাস পর্বত হইতে মা দুর্গা প্রতি বত্সর সন্তানদের সঙ্গে করিয়া পিত্রালয় মর্ত্যে বেড়াইতে আসেন। আসেন প্রতিবত্সর আশ্বিন মাসের পঞ্চম তিথিতে। মহাধুমধাম ও আনন্দোত্সবের মধ্যে পাঁচ দিন কাটাইয়া যান এইখানে। এই বত্সরও দেশব্যাপী শান্তি ও সৌহার্দমূলক পরিবেশেই অনুষ্ঠিত হইতেছে এই পবিত্র ধর্মীয় উত্সব।
পৌরাণিক সাহিত্য ‘মহাভারত’ হইতে জানা যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে জয় ত্বরান্বিত করিতে অর্জুনকে দেবী দুর্গার স্তব করিতে উপদেশ দিয়াছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বঙ্গভূমিতে সর্বপ্রথম এই পূজা প্রচলন করেন বলিয়াও জানা যায়। দেবী দুর্গা যেহেতু অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করিয়া দেবকুলকে রক্ষা করিয়াছিলেন, তাই তিনি সত্য, শুভ ও ন্যায়ের পক্ষে সংগ্রামকারীদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার মূর্তপ্রতীক। এইজন্য তাঁহার আগমনে আমাদের সমাজ এত আলোড়িত হয়। ধর্মে-কর্মে, সৃজনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিল্প-সাহিত্যে সর্বত্র আসে গতিময়তা। মা দুর্গা আসেন দেবলোক প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত। ইহাছাড়া সমাজের উন্নতি সম্ভব নহে। মায়ের আরেক নাম দশভূজা- মহিষমর্দিনী। সাধারণত কালো মহিষ গোয়ার্তুমির জন্য প্রসিদ্ধ। সুতরাং মহিষাসুর বধ সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানের মর্মকথা হইল, নিজের অহমিকা ও পশুত্বকে বলি দেওয়ার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।
এইবারের পূজা উপলক্ষে আমাদের প্রার্থনা হইল, সকলের দুর্গতি, দুর্ভাবনা, আশঙ্কা ও হতাশা নাশ হউক। মন্ত্রের ভাষায়— ‘সর্বে ভবন্ত সুখিন’। আমাদের আকাশ-বাতাস তৃণলোক মধুময় হউক। মধুময় হউক আমাদের গৃহসমূহ। সকল ক্ষেত্রে উন্নতি ও আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হউক। সবাইকে জানাই শারদীয় দুর্গোত্সবের অনাবিল প্রীতি ও শুভেচ্ছা।