রাজনীতি ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা

নিছক সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এই দেশের রাজনীতিকদের অনেকেই একেক সময় এমনসব কথা বলেন যাহা শুনিলে তাহাদের বোধবুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা সম্পর্কে এক প্রকার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় বৈ কি! এমনিতেই এদেশের রাজনীতির মহিমা অপার। এই ‘মহিমাময়’ রাজনীতির মাহাত্ম্য অনুধাবন করিতে হইলে রকেট সায়েন্স জানিবার কোন প্রয়োজন পড়ে না। এই দেশের আমজনতা, যাহাদেরকে আমরা মুর্খ-অশিক্ষিত বলিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতে সচেষ্ট থাকি তাহারাও যে রাজনীতিকদের এহেন কথাবার্তা শুনিয়া প্রমাদ গণিয়া থাকে, তাহা নিশ্চয়ই কাহাকেও বুঝাইয়া বলিবার প্রয়োজন হয় না। সাবেক মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘকালীন সাবেক মেয়র আর বিএনপির অন্যতম প্রধান নেতা সাদেক হোসেন খোকা গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের উদ্বোধনের ঘটনাটিকে মাথায় রাখিয়া গত শনিবার দলের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারসহ বিএনপি সরকার আমলের নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বর্তমান সরকার হাইজ্যাক করিয়া নিজেদের উন্নয়ন দাবি করিতেছে। তিনি আরও দাবি করিয়াছেন যে, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার এমনকি হাতিরঝিল প্রকল্পসহ ঢাকার দৃশ্যমান সব উন্নয়ন কাজ বিএনপি করিয়াছে। তাহার মতে, বিএনপি আমলে শুরু হওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ বর্তমান সরকার ‘রুটিন ওয়ার্ক’ হিসাবে সমাপ্ত করিয়া তাহারা সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দাবি করিতেছে। এইসব বক্তব্য হইতে প্রতীয়মান হয় যে, তাহাদের আমলে শুরু হওয়া কাজ এই সরকার সম্পন্ন করিয়া যে বাহ্বা কুড়াইতেছে উহা সরকারের জন্য কোন গৌরবের বিষয়ই নহে! মন্ত্রী ও মেয়র হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করিয়াও তাহার মনে কেন এই বোধটি ঠাঁই নিলো না যে, সরকার হইতেছে একটি অব্যাহত বা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বিশেষ। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী এক সরকার যাইবে ও আরেক সরকার আসিবে। আর সেই ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকার গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রমগুলি নূতন সরকার আসিয়া অব্যাহত রাখিবে ইহাই নিয়ম এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি প্রধানতম শোভন দিক। আমাদের এই সীমিত সম্পদের দেশে একেক সরকার আসিয়া ইচ্ছা মাফিক যদি একেক ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ হাতে নেয় এবং পূর্ববর্তী সরকারের সকল কার্যক্রম বাতিল করিয়া দেয় তাহা হইলে ইহাতে শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদেরই অপচয় ঘটে না বরং প্রতিহিংসার রাজনীতির চিত্রই ইহাতে অধিক ফুটিয়া উঠে। তিনি দাবি করিয়াছেন যে, বর্তমান সরকারের যাবতীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের চল্লিশ ভাগই তাহাদের আমলে শুরু হইয়াছিল। ইহা ভাল কথা কিন্তু বর্তমান সরকার ঐসব কাজ যদি আজ সাফল্যের সহিত সম্পন্ন করিয়া গৌরবের ভাগীদার হয় তাহাতে কাহারো প্রাণ পোড়ানির কোন কারণ থাকিতে পারে কি? বরং তাহাদের তো ইহাতে খুশী বনিবারই কথা—যদি সত্য সত্যই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তাহার বা তাহাদের আস্থা-বিশ্বাস থাকে! তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেকের মতো সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধেও মামলা হইয়াছিল সীমিত সম্পদের এই দেশে অপচয় দুর্নীতি ইত্যাদির অভিযোগে। যাহা হউক, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ঢালাও অপচয় এই দেশে অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। ফলে এক সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কার্যাবলী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নূতন সরকারের চক্ষুশূল হইয়া দেখা দেয় এবং তাহারা আসিয়া প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ বাতিল করিয়া দেয় বিধায় ঐসব উন্নয়ন কার্যক্রম অবশেষে মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। ইহাতে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়। একটি কথা সকলেরই মনে রাখা উচিত যে, যত্রতত্র খেয়াল-খুশীমতো রাস্তাঘাট, ব্রীজ-পুল-কালভার্ট নির্মাণের মতো অর্থ আমাদের নাই। আবার এই পরিকল্পনাহীন নির্মাণ কাজ এমপি সাহেবদের প্রধানত সংকীর্ণ ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থেই করা হইয়া থাকে যাহা অপরিণামদর্শিতার চূড়ান্ত এবং সম্পদের অকাল বিনষ্টিরই নামান্তর মাত্র!