আলোকপাত

দুর্নীতি না থাকলে এদেশ সিঙ্গাপুরের মত হতো

শুধু সম্পদ থাকলেই কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানো যায় না। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে তার জনবল ও শাসন-ব্যবস্থাপনার উপর। সীমিত সম্পদ দিয়েও শুধু দক্ষ, সত্ ও নিষ্ঠাবান জনবলের সাহায্যে একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছানো যায়। সিঙ্গাপুর এদিক দিয়ে একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দেশটির সম্পদ বলতে ভূমি ও সমুদ্র সৈকতই আছে। খনিজ সম্পদ, তেল, গ্যাস কিছুই নেই দেশটির। তথাপি সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু জিডিপি ৬১,৫৬৭ সি. ডলার যা পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। আগামী ৫ বছরের মধ্যে সেটা ৭৭,০০০ সি. ডলারে উন্নীত হবে। এই অকল্পনীয় অর্জনের পিছনে আছে দেশটির শিক্ষিত, সত্, কর্মঠ জনবল এবং একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সে দেশে আইনের শাসন ও প্রতিনিয়ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শাস্তি কার্যকরী করা হয়। সেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে একজন ঝাড়ুদারও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আইনের আওতায় শাস্তি পেয়ে থাকেন। কাজে ফাঁকি দেয়া বা দুর্নীতি করা কাকে বলে সিঙ্গাপুরের জনগণ জানে না। ঐ দেশে প্রতি ডলার আয় ও সম্পদের ওপর জনগণ কর দেয় এবং প্রতি ডলার করের অর্থ সরকার দেশ ও জনগণের উন্নতি ও কল্যাণের জন্য ব্যয় করে। কালো টাকা বলে সেখানে কারুর কিছু নেই। এবার বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখতে পাই সিঙ্গাপুরের তুলনায় বাংলাদেশের সম্পদ অনেক বেশি। প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস ও কয়লা ছাড়াও রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য পাট, চা, চামড়া, হিমায়িত ও তাজা খাদ্য, শিল্প-পণ্য পাট ও চামড়াজাত দব্য, তৈরি পোশাক, সমুদ্রগামী জাহাজ ইতাদি। সর্বোপরি রয়েছে আমাদের প্রায় ১ কোটি প্রবাসী মানব সম্পদ যারা বছরে প্রায় ১,২০,০০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠায়। অথচ শুধুমাত্র দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক তথা প্রশাসনিক অস্থিরতার জন্য দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি থমকে দাঁড়ায়। গত কয়েকদিনের কিছু দুর্নীতির চিত্র দেখা যাক। হতদরিদ্র মানুষের প্রাপ্য ধনীরা মেরে খাওয়ায় দারিদ্র্য কমছে না। বিশ্ব জলবায়ু ফান্ড থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য ১৭০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে গত ৩০ জুন পর্যন্ত ১৪৭ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হয়। এই অর্থে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৬৩টি এনজিওকে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু টিআইবির অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জানা গেছে যে ৬৩টি এনজিওর মধ্যে ১০টির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি (মা:জ: ৪/১০/১৩)। অস্তিত্বহীন এনজিওকে অর্থ বরাদ্দের উদ্দেশ্য কি হতে পারে সহজেই অনুমেয়। এরকম হাজারো রকমের দুর্নীতির ঘটনা প্রতিবছর ঘটে যাচ্ছে যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাউবোর মতে, পিডিবি, সড়ক ও জনপথ, স্বাস্থ্য বিভাগ, কর ও শুল্ক বিভাগ ইত্যাদি সরকারি বিভাগগুলোর দুর্নীতি এখন সবারই জানা। বাজেট বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশই কোন কোন ক্ষেত্রে ভাগ ভাগ হয়ে চুরি হয়ে যায়। বাকি টাকার কাজ হলেও তা মানসম্মত নয়। দৈনিক প্রথম আলোর ১০ অক্টোবরের জরিপে মহাজোট সরকারের আমলে দুর্নীতির হার ৪২%(২০০৯) থেকে ৩৪%-এ(২০১৩) নেমেছে। অর্জন খারাপ নয়, তথাপি ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব বা বাজেট বরাদ্দ থেকে ৩৪ টাকা দুর্নীতিবাজের পকেটস্থ না হলে দেশ আরও বহুদূর এগিয়ে যেতো, অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি চলে যেতো। দুর্নীতি ঠেকানো বা প্রতিকারের জন্য রয়েছে সরকারের সংস্থা দুদক। যেখানেই দুর্নীতি হবে সেখানেই দুদক তদন্ত করে আদালতে মামলা করবে। কিন্তু খোদ দুদকের প্রাক্তন চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন যে সংস্থাটি একটি দন্ত-নখরহীন ব্যাঘ্র বা কাগুজে বাঘ। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে দুর্নীতিবাজদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে শাস্তি না দিলে দুর্নীতি কোনদিন বন্ধ হবে না। কারণ আমাদের নৈতিকতার কোনদিন উন্নতি হবে না। ক্ষমতা তথা অগাধ অর্থ সম্পদ কুক্ষিগত করা বা ধরে রাখার জন্য আমরা যা খুশি তাই করি। আমরা না শুধরালে প্রজন্মও নৈতিকতা শিখবে না। অন্যদিকে দুদকের বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। লোকবল কম, ক্ষমতা কম, হরহামেশা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে দুদক স্বাধীন ও দক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। কোন সরকার দুদককে শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে উত্সাহী নয়। সুতরাং দুর্নীতি চলতেই থাকবে, এবং আমাদের মধ্যে নৈতিক পরিবর্তনও আসবে না। সিঙ্গাপুরের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতাদি দশগুণ বাড়িয়ে দিলেও দুর্নীতি বন্ধ হবে না। সুতরাং এ দেশের ভাগ্যে কি আছে স্বয়ং আল্লাহই বলতে পারবেন। লেখক:এফসিএ ও কথা-সাহিত্যিক