জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি

শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠানটির সাথে আমার সম্পর্ক ছিল শুধু ছাত্র হিসেবে। বিভাগের শিক্ষকদের স্নেহ, বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে ব্যস্ততা, পড়ালেখা, খেলাধুলা, আড্ডা, গান, সেশন জট— সবমিলে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মনোজগতে প্রাধান্য ছিল ভালোলাগারই। মোটামুটি অনেকটা সময় সাংবাদিকতায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং, আওয়ামী লীগ বিট কাভার করাসহ নানা পর্যায়ে কাজ করার সুবাদে জগত্-সংসার, রাজনীতি, দেশ-পৃথিবী সম্পর্কে একধরনের ধারণা, স্বাদ-বিস্বাদ, অভিলাষ, পর্যালোচনা, সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েই ছিল। অভ্যস্ত পৃথিবী থেকে নতুন পৃথিবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় আসার আগে মনে নানা ভাবনা, স্বপ্ন, চিন্তা, খানিকটা সংশয়, চ্যালেঞ্জ— ইত্যাকার নানা অনুভূতি কাজ করেছে। শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের আগের ভাবনা আর পরবর্তী অভিজ্ঞতার মধ্যে বৈসাদৃশ্যই যেন বেশি। গত দেড় বছরের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন প্রতিনিয়ত আমাকে বিমুগ্ধ করেছে, মানব-পরিবেশ মাঝে মাঝেই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন উপাচার্যকে বিদায় নিতে দেখেছি। আরেকজনকে দেখছি কখনো প্রশাসনিক সদর দফতরে প্রবেশ করতে পারছেন না, কিছুদিন আগে দেখলাম দীর্ঘ সময় নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ থাকতে। সম্প্রতি ভিসি্ মহোদয় চলমান আন্দোলনের প্রতিবাদে স্বয়ং বাড়ির বাইরে শুয়ে-বসে থাকার বিরল কর্মসূচি পালন করতে শুরু করেছেন। গত ২৪ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সাথে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের বৈঠকের ফলশ্রুতিতে যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেটি মাস খানেক ‘কাজ’ করে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছেন বলে পত্রিকা মারফত জানা যায়্। তদন্তকালীন সময়ে শিক্ষকরা আন্দোলন স্থাগিত করায় মাসখানেক বিশ্ববিদ্যালয় সচল ছিল। প্রতিশ্রুত সময়ের ভেতরে রিপোর্ট জমা না দেয়া ও দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেয়ার প্রতিবাদে শিক্ষকরা আবার আন্দোলনে নেমেছেন। সচেতন মনে বা প্রকাশ্যে ভিসি কিংবা আন্দোলনকারী শিক্ষকবৃন্দ, কেউই আসলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হোক চান না, কিন্তু বাস্তবতা হল দোষ যে পক্ষেরই হোক না কেন, তাকে ছাত্র-ছাত্রী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি তাতে বিন্দুমাত্র কমে না। যদি আনোয়র হোসেন পদত্যাগ করে চলে যান, তাহলে আপাতত হয়ত আন্দোলন শেষ হবে, কিন্ত পরবর্তী ভিসি কে হবেন এই ইস্যুতে, যিনি হোন না কেন তার বিরুদ্ধেও যে তার নিজের দোষই হোক বা নিছক রাজনীতির জন্যই হোক, একই রকম আন্দোলন হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? পূর্ববতী ভিসি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রসায়নবিদ প্রফেসর ড. শরীফ এনামুল কবীর একাডেমিক ও অবকাঠামোগত প্রভূত উন্নয়নমূলক কাজ করেও ভিসি পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেনও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঠিকভাবে চালাতে পারছেন না। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা কি ভিসি মহোদয়গণ নিজেই? ভিসিগণের নিজেদের অপকর্মের জন্য আন্দোলন হয় না কি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে একদল শিক্ষক পদ্ধতিগত আন্দোলনের মাধ্যমে একের পর এক ভিসিকে সরিয়ে দিচ্ছেন? সবার প্রত্যাশা ছিল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে ঘটনাগুলোকে তদন্ত করে দেখবে সরকার। উত্থাপিত অভিযোগগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, দাপ্তরিক কাগজপত্র যাচাই করে ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে একটা বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত সম্পাদন করতে হবে। এখানে ব্যক্তি বা দলনিষ্ঠ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। গত চল্লিশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, এর পেছনে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই, শুধুমাত্র প্রগতি আর উত্কর্ষতার পথে অগ্রসর হতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি, গ্রুপ থেকে গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিষ্ঠানকে। ভিসির পক্ষের লোকেরা বলেন, আন্দোলন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অন্যদিকে বিপক্ষের লোকজন বলেন, আন্দোলনের যথেষ্ট যুক্তি আছে। উভয়পক্ষই সর্বপ্রকারে নিজেদের সত্য প্রমাণে ব্যস্ত। আন্দোলন যৌক্তিক হোক আর অযৌক্তিক হোক, একটা বিষয় সবাইকে স্বীকার করতেই হবে, আন্দোলন কিন্তু বেশ শক্ত কিছু পর্যায় পার হয়ে এসেছে। এখন আসলে দরকার অচলাবস্থার স্থায়ী নিরসন। আবার অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ছাত্র সমাজ নিজেদের ক্ষতি আর কত সহ্য করবে? কয়েক মাস ধরে চলা আন্দোলনের এক পর্যায়ে ভিসিকে তার কার্যালয়ে ৮৪ ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষকরা। পরে শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের মধ্যস্থতায় ভিসি মুক্ত হয়ে ঘরে ফেরেন। প্রধান বিষয় হয়ে উঠে তদন্ত কমিটি ও ভিসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ। অভিযোগসমূহের মধ্যে আছে ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম, ‘অযোগ্য’ প্রার্থীকে শিক্ষকপদে নিয়োগদান, কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির অর্থ আত্মসাত্ ইত্যাদি। আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষাত্কার নিয়ে তদন্ত কমিটি তাদের অনুসন্ধান পরিচালনা করে প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছেন বলে জানা যায়। সবার প্রত্যাশা ছিল তদন্ত কমিটির রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থার নিরসন ঘটবে। কিন্তু তদন্ত কমিটির রিপোর্ট কিংবা শিক্ষামন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপসমূহ আন্দোলনকারী শিক্ষকবৃন্দের মনঃপুত না হওয়ায় তারা স্থগিত আন্দোলন আবার শুরু করলে শিক্ষামন্ত্রী সংসদ ও সাংবাদিকদের কাছে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। সাভারের স্থানীয় পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে শিক্ষকদের ‘বোঝানোর’ চেষ্টা করা হয়। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সময়মত বিবেচনায় না নিয়ে আইনানুগ পদক্ষেপের কথা বললে ক্যাম্পাসে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত গত অক্টোবর ৮ তারিখে রাতে শিক্ষা সচিব শিক্ষকবৃন্দের সাথে বৈঠকে আবারো সময় চাইলে আন্দোলনকারীরা আন্দোলন স্থাগিত করার সম্মতি জ্ঞাপন করেন বলে পত্রিকা মারফত জানা যায়। এভাবে দুই দফা ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণায় সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে। অক্টোবর ১০ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদের ছুটি শুরু হলে আপাতত ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘মুক্তি’ লাভ ঘটে। এ তো গেল, আন্দোলন সংক্রান্ত খবরাখবর। মূল বিষয় হল আন্দোলন ও ভিসির অনড় অবস্থানের ফলে ব্যাহত একাডেমিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে সেমিস্টার সিস্টেম ভিত্তিক বিভাগগুলো ২/৩ মাসের সেশন জটে পড়বে বলে আশংকাজনক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। তার চেয়েও বড় বিষয় হল, ২০১৩-১৪ সেশনের ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার কথা ঈদের পর। কিন্তু আন্দোলনে ডিনদের ও বিভাগীয় সভাপতিবৃন্দের অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের প্রতি অনাস্থার ফলে ভর্তি পরীক্ষার কোনো প্রক্রিয়াই এগুচ্ছে না। যদিও ভিসি অফিস থেকে বলা হচ্ছে যথাসময়েই ভর্তি পরীক্ষা হবে। প্রশ্ন হলো আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে সমাপ্ত না হলে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে? আমরা যত দ্রুত সম্ভব চলমান অবস্থার পরিবর্তন চাই। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কাম্য নয়। এক্ষেত্রে সরকার, ভিসি ও আন্দোলনকারী শিক্ষক সকলকেই আরো সততা, দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সাথে সংকট নিরসনের পথ খুঁজে বের করতে হবে। সব পক্ষকেই আরো বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক হতে হবে। ছাত্র-ছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোক্রমেই আর ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। লেখক :শিক্ষক, সাংবাদিকতা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়