স্মরণ
কবির ভাই :কিছু স্মৃতি কিছু কথা
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৬
সাংবাদিকতা পেশায় যোগদানের আগে থেকেই আমি তার নামের সাথে পরিচিত ছিলাম। যার হাত ধরে ঢাকায় আসা দৈনিক ইত্তেফাকের আরেকজন চীফ রিপোর্টার ও পরবর্তীতে বাসসের বাণিজ্যিক বিষয়ক সম্পাদক মীজানুর রহমানের কাছে। ১৯৮৫ সালে সাংবাদিকতা পেশায় গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসি দৈনিক জনতা পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্বপালন কালে যেসব কাজ করেছেন তা যে শুধু রিপোর্টারে জন্য করেছেন তা নয়; গোটা সাংবাদিক সমাজের জন্যই করেছেন। ১৯৯৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে জাতীয় প্রেসক্লাবের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল। তার বিশেষ উদ্যোগের কারণে দেশের প্রায় ৪৬ জন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিককে সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করা সম্ভব হয়েছিল।
হোটেল সোনারগাঁও-এ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এজিএম করার অনেক স্মৃতিমধুর ঘটনা বারে বারে নাড়া দেয় তাত্ক্ষণিকভাবে। প্রথম দুই বছরে কবির ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা যারা কাজ করেছি তিনি আমাদের সংগঠন করার মাধ্যমে মানব সেবায় প্রেরণা যুগিয়েছেন। সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সেই স্মৃতিগাথা ছবি শোভা পায়। আলোচনা-সমালোচনার মাঝে দল-মত নির্বিশেষে সবাই মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানটি ছিল এক বিরাট ঘটনা। যা কখনো ভোলার নয়। কবির ভাইয়ের সাথে জাতীয় প্রেসক্লাবে যখনই দেখা হতো আমাকে ডেকে কাছে বসাতেন আর খোঁজ-খবর নিতেন। মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকদের সংবর্ধনা প্রদানের জন্য যে উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার একজন সদস্য হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমাদের সাথে তালিকা প্রস্তুত করা নিয়ে প্রায়ই তিনি বৈঠক করতেন। নাম যাচাই-বাছাই করার মতো কঠিন কাজ আর কী হতে পারে। তিনি বলতেন কাজ করতে গেলে কিছু দোষ হবেই। আর তার জন্য কাজ বন্ধ করা যাবে না। সংগঠন করলে মানুষের কাছে যাওয়া যায়। নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়। আজো মনে পড়ে তিনি আমাকে রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রথম এজিএমের স্মরণিকাটিতে কাজ করতে বেশ অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে দিয়ে সংগঠনের দুই বছরের কার্যক্রমের প্রতিবেদন তৈরি করার পর তার একটি শিরোনাম দিয়েছিলেন যা আজ কবির ভাইয়ের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে আর তা হলো ‘‘স্মৃতিমধুর বেদনা”। কবির ভাই সাংবাদিক লেখক হিসেবে দেশ-বিদেশে বেশ সুপরিচিত। তাকে নিয়ে অনেক লেখার আছে। তবে তিনি ছিলেন খুবই ভোজনরসিক। আমার মনে পড়ে রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রথম সভাপতি হিসাবে কবির ভাই কার্যনির্বাহী কমিটির সকল কর্মকর্তার স্ত্রীদেরসহ হোটেল কস্তুরিতে একটি ডিনার পার্টি দিয়েছিলেন। আরো অনেক ঘটনা আছে যা নিয়ে অনেক লেখার আছে। আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি তিনি ছিলেন সংগঠন প্রিয় এক সাহসী রিপোর্টার। তা না হলে শূন্য হাতে সোনারগাঁও হোটেলে রিপোর্টার্স ইউনিটির এজিএম করেছেন আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে। আবার বিরাট অংকের বিলও পরিশোধ করেছেন। ভবিষ্যতে রিপোর্টার্স ইউনিটি সোনারগাঁও হোটেলে আর কোন এজিএম করতে পারবে কিনা তা জানি না, তবে কবির ভাই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যা রিপোর্টাররা কোনদিন ভুলতে পারবে না। যতদূর জানতে পারি, কবির ভাই গত রবিবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর জুরাইনস্থ নিজ বাসভবনে অসুস্থতাবোধ করলে বেলা ২টায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানান, তিনি পথেই মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওয়ের বারদী গ্রামে ১৯৪২ সালের ১১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন শফিকুল কবির। তার পিতার নাম মরহুম আফসার সাকির ও মাতা মরহুমা আছোরজান বেগম। ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি ডিআরইউ’র লাইফটাইম এচিভমেন্ট পুরস্কার পান। শফিকুল কবির প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে টিকাটুলি থেকে পিকাডেলি, যুদ্ধ ও নারী, সোনার পালংক। কবির ভাই আজ নেই। কিন্তু তার অবদান সাংবাদিক সমাজ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে যুগ যুগ ধরে ।
লেখক :সদস্য রিপোর্টার্স ইউনিটি ও সদস্য প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটি