[ রা জ নী তি ]

শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানের মাধ্যমে নির্বাচন প্রত্যাশা

সম্প্রতি একটি দৈনিকে জনমত-জরিপ ২০১৩ প্রকাশিত হয়েছে। জনমত জরিপে বলা হয়েছে যে, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার চান ৮২%। তাদের এই জরিপে ইতোমধ্যে জনগণের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই জরিপটিতে অংশগ্রহণ করেছে মোট পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ। দেশে মোট জনসংখ্যা যেখানে ষোল কোটি সেখানে পাঁচ হাজার নারী -পুরুষের উপর জরিপ চালালে সঠিক পরিসংখ্যান কখনো পাওয়া যায় না। এদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির উপর বিভিন্ন Econometric model তৈরি করতে গিয়ে প্রাইমারী সোর্স থেকে যখন-ই কোন ধরনের গবেষণা পরিচালনা করা হয় তখন-ই সেম্পেল সাইজ অবশ্যই মোট পপুলেশানকে যথার্থভাবে প্রতিফলন করতে হয়। এই জরিপটি আসলে এক ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়। এই জরিপের ডাটা হচ্ছে পারপাসিক সেম্পলিং। এটির গবেষণা পদ্ধতি মোটেই যৌক্তিক ছিল না। উপরোক্ত জরীপের ডাটা নিয়ে যখন ভেলিভিটি এবং রিলেবিলিটি টেস্ট হয় তখন-ই দেখা দিয়েছে যে, ডাটা যথার্থ নয়। এমনকি ক্রোনাবেচ আলফার মান হয়েছে ঋনাতক এবং তা হচ্ছে .০০০০০০০ ১। এই জরীপের মূল্যায়ন দেশের জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র, তার নানা দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতাই সময়ের বিবর্তনে সংশোধিত হয়ে বাস্তবতা পূর্ণ করবে বলে প্রতীয়মান হয়। এদেশের মানুষ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কখনো পিছপা হবেন না। এক্ষণে যদি নির্দলীয় সরকার গঠিত হয় তাহলে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। আসলে পরিসংখ্যানকে সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের নানাভাবে সহায়তা করা যেতে পারে। ঐ পত্রিকায় প্রকাশিত জরিপে বলা হয়েছে ৫৪% মনে করেন যে, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে সমঝোতা হবে না। এটি আসলে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। যদি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমঝোতা না হয়, তবে ১/১১-এর মত পরিস্থিতির সৃষ্টির পাঁয়তারাও হতে পারে। অথচ দেশের রাজনীতিবিদরা নিশ্চয়ই এই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে আশা প্রকাশ করে না। কেননা তারা নিশ্চয়ই ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গৃহীত Depoliticisation পদ্ধতি সৃষ্টির প্রয়াসের কথা ভুলে যাবেন না। আসলে একটি দেশের উন্নয়ন তখন-ই সম্ভব যখন রাজনীতিবিদরা সর্বোচ্চ ত্যাগ তিতিক্ষা দ্বারা রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিচালনা করে থাকেন। অবশ্য কিছু সুবিধাভোগী যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে উত্সাহী হয়, তারা একদিকে রাজনীতিবিদদের কুপরামর্শ দিয়ে থাকেন অন্যদিকে চেষ্টা চরিত করেন গণতন্ত্র হরণের জন্যে। তারা নিরপেক্ষতার মুখোশ এঁটে সরকারি এবং বিরোধী উভয় দলকেই বিভ্রান্ত করে জনস্বার্থ হরণ করে থাকে। এক্ষেত্রে তারা নানামুখী ছলচাতুরি করে থাকেন। ফ্রান্সের মত দেশে দু’শ বছরের বেশি লেগেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। ১৯৬২ সালে পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে দ্যা গলের নেতৃত্বে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পৌনে দু’শ বছর লেগেছে গণতন্ত্র সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যে। আমাদের দেশে ইদানিং এক ধরনের সিভিল সোসাইটির সদস্য, কনসালটেন্ট ও কতিপয় এনজিও-এর মধ্যে এক ধরনের oligopolistic nature-এর আঁতাত: গড়ে উঠছে, যারা বহুরূপীভাবে দেশকে দুর্নীতিপরায়ন হিসাবে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছে। তাদের এই অপচেষ্টা আসলে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন পার্বন যেমন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় শারদীয় উত্সব (হিন্দুদের ক্ষেত্রে) এবং পবিত্র ঈদুল আজহার (মুসলমানদের ক্ষেত্রে) উত্সবের ক্ষেত্রে উত্সাহ উদ্দীপনা ম্লান করে দিয়েছে নানামুখী আতংঙ্কে। উক্ত জরিপে দেখা যায় যে, ২০১৩ সালে ৫০.৩% বিএনপিকে এবং ৩৬.৫% আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চান। তাদের এই তথ্যও কেমন যেন ভ্রান্ত। কেননা কোন পরিসংখ্যানবিদই বলবে না যে ৫০০০ লোক কখনো ১৬ কোটি লোককে যথার্থভাবে প্রতিফলন করে থাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবারই আছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন দেশের মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণ এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয় সেটি সত্যি দুঃখজনক। সাধারণ মানুষ ২৫শে অক্টোবর কি হবে যে শংকায় শংকিত হয়ে পড়েছে। অথচ এমনটি হবার কথা ছিল না, দু’ টো বড় দলের মধ্যে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে দেশের উন্নয়নে অরো অনেক বেশী গতিময়তা আসত।তবে গত পৌঁনে পাঁচ বছর আর্থিক খাতে অর্জন কম নয়। বাংলাদেশের ন্যায় একটি উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতি রয়েছে। দুর্নীতি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা গেলে ভাল হতো। আসলে কেবল উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত দেশেও দুর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষুদ্রস্বার্থের কারণে কেউ বিদেশি প্রভুদের কাছে স্বীয় স্বার্থে বদনাম করে না। যে রিপোর্টটি ঐ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাতে দেখা যায়, রাষ্ট্র ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ৬০%। আসলে এই ভুল পথ কিসের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি আমাদের জানা দরকার। গত পৌনে পাঁচ বছর সড়ক-রেলপথে বেশকিছু ইতিবাচক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বিদ্যুত্ খাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে বিদ্যুত্ খাতের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। এদিকে ঐ পত্রিকায় ইতঃপূর্বে চট্টগ্রামের আনোয়ারার পাকশীতে বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে গেল, তখন বিরূপ প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল। অথচ আনোয়ারার পাকশীতে খুব স্বল্প লোকের বাস এবং জোয়ারের জন্যে লবণাক্ত হওয়ায় খাদ্য শস্য উত্পাদন হয় না। এই সমস্ত কারণে যথাযথ তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করলে ভাল হতো। বাংলাদেশের জনগণ কখনো ভুল করে না। তারা এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে যথার্থ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশকে স্বাধীন করেছে। যখনই গণতন্ত্রের উপর কোন ধরনের কালো ছায়া পড়েছে তখনই তারা তার প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ফলে দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চা অবাধ হোক এই প্রত্যাশা বিদেশি কিছু দেশ চায় না। গত পৌনে পাঁচ বছরে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস অনেকাংশে নির্মূল করা গেছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম চালু হওয়া এটি অবশ্যই সিংহভাগ জনগণের চাহিদার প্রতিফলন। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকার বেশ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছে। যারা জঙ্গিবাদ সন্ত্রাস সমর্থন করে তারা কিন্তু চুপচাপ বসে থাকার কথা নয়। দু’টো বড় দলের মধ্যে যখন এক ধরনের স্নায়ুবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা কাজ করছে তখন তার সুযোগ নিয়ে বিদেশি এজেন্টরা বিভিন্ন ধরনের অপকৌশল নিয়েছে। তাদের এই অপকৌশল আসলে দেশের অব্যাহত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে। জনমনে যে শঙ্কা নেমে এসেছে তার ফলে বিদেশ থেকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা হ্রাস পাবে এবং পোশাক খাতেও বিদেশি ক্রেতারা আগের মত অর্ডার প্লেইস করবেন না। অর্থমন্ত্রী আইএমএফের বৈঠকে অংশ নিতে গিয়েছিলেন দারিদ্র্য দূরীকরণ বিষয়ে। আইএমএফ অভিমত ব্যক্ত করেছে যে, আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য দূরীকরণ করা সম্ভব হবে। অর্থমন্ত্রী অবশ্য ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে দারিদ্র্য দূরীকরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে সবার মনে শঙ্কা সেটি হচ্ছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। নচেত্ দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। দেশের মানুষের আর্থিক উন্নতিও সম্ভব নয়। আশা করব, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দু’টো বড় দলের মধ্যে সমঝোতা হবে। বিএনপির উচিত হবে তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দেয়া। নচেত্ কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলে আর্ত চীত্কার করলে তা জনগণের কাছে বোধগম্য হবে না, শান্তিপূর্ণভাবে যাতে আগামী নির্বাচন হয় সেজন্য জননেত্রী শেখ হাসিনার একটি কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে তিনি দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে তার বক্তৃতা রেডিও টিভির মাধ্যমে গতকাল দিয়েছেন। তিনি জাতীয় নির্বাচনে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের পাশাপাশি বিরোধীদলের কাছ থেকে সরকারে অংশ নেয়ার জন্যে নাম প্রস্তাব আহ্বান করেছেন। একই সাথে প্রয়োজনে বিরোধীদলকে সংসদে মূলতবী প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আশা করি বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবেন। আবার বিরোধীদলের অসহযোগিতার সুযোগে কেউ জ্বালাও পোড়াও নীতি গ্রহণ করবে না। নচেত্ যে ফ্রাংকেস্টাইন গড়ে উঠবে তা কিন্তু কোন দলকেই রেহাই দিবে না। সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, তাদের হাত থেকে জনগণ রেহাই চায়। বাংলার জনগণের চাহিদা খুব কম, তারা কেবল শান্তি চায়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র চর্চা যে কোনভাবেই হোক অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করছি। একই সাথে আশা করব সুযোগ সন্ধানীরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের কুপরামর্শ থেকে জাতিকে রেহাই দিবেন। তৃতীয়পক্ষ সৃষ্টির অপপ্রয়াস রোধকল্পে উভয় দলকেই সতর্ক থাকতে হবে। রাজনীতি হবে দেশের জনকল্যাণের জন্যে। ইগো বাদ দিয়ে সমঝোতার দিকে এগুলে এ রাষ্ট্র উন্নত হবে এবং সুন্দরভাবে প্রশাসন যন্ত্র নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা দরকার। নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। যে দল-ই জিতুক যাতে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকে এবং কোন ধরনের হিংস তা ও অসন্তোষ সৃষ্টি না হয় তার দায় কিন্তু দেশের দু’টো বড় দলের উপর বর্তায়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে উভয় দলের কাছ থেকে ন্যায় সংগত ভূমিকা প্রত্যাশা করছি। লেখক :উপাচার্য, প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ই-মেইল: pipulbd@gmail.com