সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সক সংকট

সরকার যখন অব্যাহতভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করিবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছে, তখন চিকিত্সক সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালসমূহের চিকিত্সা কার্যক্রম। সেই সংকট কোন্ পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে তাহা অনুধাবন করিবার জন্য বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান চিত্রটি এইখানে তুলিয়া ধরা যাইতে পারে। অর্ধশত বত্সরের পুরনো এই হাসপাতালটিতে কাগজে-কলমে ৯ জন চিকিত্সক থাকিবার কথা। কিন্তু আছেন মাত্র ২ জন। অ্যানেসথেসিস্টের অভাবে শুধু যে অপারেশন বন্ধ আছে তাহাই নহে, সেই সাথে বন্ধ হইয়া গিয়াছে প্রসূতি মায়েদের অতি জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও। লক্ষণীয় যে, ৩১ শয্যার এই হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করিবার কারণে যেইখানে চিকিত্সকের সংখ্যা এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাইবার কথা, সেইখানে চিকিত্সকের অভাবে হাসপাতালটির চিকিত্সা কার্যক্রমই বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। বাবুগঞ্জের সহিত দেশের অন্যান্য জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের খুব একটা প্রভেদ যে নাই তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। চিকিত্সকের জন্য হাহাকার প্রায় সর্বব্যাপী। নূতন নূতন ভবন হইতেছে, ৩১ শয্যার হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত হইতেছে কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান হইতেছে না। নীতিনির্ধারকগণ বিষয়টি জানেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের অসহায়তার কথা স্বীকার করিয়াছেন। আর চিকিত্সকদের সমাবেশে প্রকাশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি করিয়াছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। ইহার পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। আপাতদৃষ্টিতে সমস্যাটি যে জটিল তাহাতে সন্দেহ নাই। চিকিত্সকসহ লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের এই দেশে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিত্সক থাকিবে না কেন— এই প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। ইহার উত্তরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন যাবত্ যেই কথাটি বলিয়া আসিতেছেন তাহা হইল, চিকিত্সকরা উপজেলা পর্যায়ে থাকিতে চাহেন না। নিয়োগ দেওয়া হইলেও অচিরেই তাহারা তদবির করিয়া অন্যত্র বদলি হইয়া যান। যাহারা বদলি হইতে পারেন না, কর্মস্থলে তাহাদের অনুপস্থিতির ব্যাপারটিও কোনো গোপন বিষয় নহে। দিনের পর দিন অনুপস্থিত থাকিয়াই নিয়মিত বেতনভাতা ভোগ করিয়া চলিয়াছেন এমন চিকিত্সকের তালিকাও দীর্ঘ। দীর্ঘদিন ধরিয়াই যে এই অবস্থা চলিয়া আসিতেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন তোলা যায় যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রায় পাঁচ বত্সর অতিক্রান্ত হইতে চলিয়াছে। এই দীর্ঘ সময়ে সমস্যাটির সমাধান হইল না কেন? সরকারি চাকরির বাধ্যবাধকতা মানিয়াই যাহারা স্বেচ্ছায় এই চাকরিতে আসিয়াছেন এবং জনগণের অর্থে যাহাদের ভরণপোষণ চলিতেছে তাহাদের প্রতি দয়াদাক্ষিণ্য দেখাইবার কোনো অবকাশ নাই। হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ যেইখানে চাকরির জন্য হাপিত্যেশ করিতেছে, সেইখানে এই ধরনের বিলাসিতা চলিতে পারে না। ইহা যে নিছক প্রশাসনিক শৈথিল্য মাত্র নহে, বরং এই ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও দলবাজির অবদানও যে কোনো অংশে কম নহে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। চাহিদার তুলনায় চিকিত্সকের সংকট তো আছেই। একসাথে কয়েক হাজার চিকিত্সক নিয়োগের মাধ্যমে সেই সংকট সমাধানের চেষ্টাও চলিতেছে বলিয়া শোনা যায়। ঢালাওভাবে সরকারি চিকিত্সাি সেবা সম্প্রসারণ, বিশেষ করিয়া নূতন নূতন হাসপাতাল নির্মাণ ও শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি যে সমস্যাকে আরও জটিল করিয়া তুলিয়াছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। চিকিত্সকের অভাবে সরকারের পক্ষে যেইখানে বিদ্যমান হাসপাতালগুলিই সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হইতেছে না— সেইখানে সামর্থ্যের সীমা লঙ্ঘনকে কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত বলা চলে না। সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সক সংকট ও অব্যবস্থার ভূরি ভূরি উদাহরণ সত্ত্বেও এই প্রবণতা যেন দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। ইহা দুর্ভাগ্যজনক শুধু নহে, অনভিপ্রেতও বটে। আমরা আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল বিরাজমান বাস্তবতার আলোকে দীর্ঘকালীন চিকিত্সক সংকটের কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানে উদ্যোগী হইবেন।