আলোকপাত

সত্যেন বসু:অনন্য এক প্রতিভা

দৈনিক ইত্তেফাকের ১২ অক্টোবর সংখ্যার ‘নোবেল পুরস্কার, ঈশ্বর কণা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু’ শীর্ষক সম্পাদকীয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। এবছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের প্রসঙ্গে প্রথিতযশা বাঙালি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে এক মূল্যবান বক্তব্য: ‘১৮৯০ সালে জন্ম নেওয়া সত্যেন্দ্রনাথ বসু খুব সাধারণ বাঙালি পরিবারের সন্তান হইয়াও বিজ্ঞান বিশ্বের অসাধারণ পাণ্ডিত্যের আসন অলংকৃত করিয়াছিলেন। নোবেল পুরস্কার তাহার মনিহার হইতে না পারিলেও বিশ্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন সংজ্ঞা’ নামে সারাবিশ্বে সমাদৃত একটি গবেষণা পদ্ধতি আছে।... আমাদের আরও গৌরব যে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব গবেষণা করিয়াছিলেন তাহার প্রায় তিন দশকব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়কালেই।’ প্রকৃতপক্ষে সত্যেন্দ্রনাথ বসু কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৪ সালের ১ জানুয়ারি। আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) নোবেলজয়ী (১৯২১) পদার্থবিজ্ঞানী। ‘বোস-আইনস্টাইন তত্ত্ব’ নির্ভুল, ‘সংজ্ঞা’ নয়। সত্যেন বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গৌরবময় অধ্যাপনায় কাটিয়েছেন দুই যুগ (১৯২১-৪৫)। শ্রী বসু প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৫ সালের গণিতে এমএসসি। ১৯২৪ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে আইনস্টাইনের কাছে প্রেরিত এক প্রবন্ধে ব্যাখ্যা দেন যে তিনি কৃষ্ণবস্তু বিকিরণের ম্যাক্স প্লাঙ্কের আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম সূত্রের একটি নতুন নির্ধারণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন যা আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বসুর প্রবন্ধের অভিনবত্ব, চমত্কারিত্ব ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অনুধাবন করলেন ও মুগ্ধ হলেন। নিজস্ব আলোককলার ক্ষেত্রে বসু প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেন। এটি আজ বসু আইনস্টাইন কোয়ান্টাম পরিসংখ্যান নামে বিশ্বখ্যাত। বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবন (Bose-Einstein Condensation) প্রসঙ্গও এই সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালে বসু কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের প্রফেসর নিযুক্ত হন। তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (১৯৫৬-৫৮) পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫৮-তে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর এবং পরের বছর ভারতের জাতীয় প্রফেসরের মর্যাদায় অভিষিক্ত হলেন। শ্রী বসু এফআরএস, দেশিকোত্তম ও পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। এ উপমহাদেশের অনন্য এক প্রতিভা সত্যেন বসু ছিলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃত্। তিনি ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরিষদের মাসিক মুখপত্র ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ প্রকাশে বিরাট ভূমিকা রাখেন। এই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ১৯৭৪-এর ৪ ফেব্রুয়ারি কোলকাতায় পরলোকগমন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে (১৯৭০-৭৫) একনিষ্ঠ বিজ্ঞানসাধককে কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছি এবং তার প্রতি নিবেদন করছি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি। লেখক: সম্পাদক, গণিতপরিক্রমা (বাংলাদেশ গণিত সমিতির মুখপত্র)