নব্য দাসত্ব অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফল
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৪
দাসত্বের শৃঙ্খলে, এখনও এই মানবিক (!) বিশ্বে প্রায় তিন কোটি মানুষ বসবাস করিতেছে। এই হিসাবটি দিয়াছে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক ফ্রি ফাউন্ডেশন। তাহাদের সর্বশেষ সমীক্ষায় বলা হইয়াছে আধুনিক বিশ্বে প্রায় তিন কোটি মানুষ দাসত্বের জীবন কাটাইতেছেন। ইহার মধ্যে শুধু ভারতেই দাসত্বের শিকার প্রায় দেড় কোটি মানুষ। আর বাংলাদেশের অবস্থান দশম স্থানে। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ দাস প্রথার শিকার। এই দাসদের জীবনকে ‘নব্য দাসত্ব’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। অর্থাত্ দাসেদের কাজের ধরন বদলাইয়াছে হয়তো, কিন্তু দাসবৃত্তিতে বাধ্য করিবার সেই পুরনো খেলা অব্যাহত রহিয়াছে। কার্ল মার্কস ১৮৬৭ সালে পুঁজিবাদি প্রথায় দাসের শ্রম ও ইহার অর্থনীতি লইয়া আলোচনা করিয়াছেন। তাহার পরে শত শত বত্সর চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু ‘দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়া উচিত’- সেই নীতিবাক্য বিলীন করিবার কার্যকর উদ্যোগ কি নিয়াছেন আধুনিক বিশ্বের রূপকাররা? জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী নিক গ্রোনো বলিয়াছেন, “অনেক দেশের সরকারের জন্যই এই সমীক্ষার ফলাফল অস্বস্তির কারণ হইবে। কিন্তু আমরা চাই সরকারগুলি বিষয়টা নিয়া খোলাখুলি আলোচনা করুক এবং সমস্যা মোকাবেলায় উদ্যোগী হউক।”
বিশ্ব জুড়িয়া দাস প্রথা ছিল সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ হইতে। এখনও আছে। এক সময় গৃহস্থালি, কৃষিতে নিয়োজিত দাসত্ব এখন আধুনিক রূপ পাইয়াছে। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলাইয়াছে দাসত্বের মাপকাঠিও। কিন্তু দাস যে সমাজের উন্নতির জন্য নিজের শ্রম দিতেছে, কিংবা নিজের সত্তা ও স্বকীয়তাকে বিলীন করিয়া দিতেছে, সেই সমাজের সদস্য হিসাবে সে কী পাইয়াছে তাহা ভাবিবার ফুরসতও তাহার নাই। কারণ সে বন্দি। তাহার এই শৃঙ্খলমুক্তি ঘটাইবার দায়িত্বও তাহার নহে, যদি মানবিক, মানবাধিকার কিংবা সাংবিধানিক অধিকারের কথা আমরা গুরুত্ব দিয়া থাকি।
ঐতিহাসিকভাবে দাসত্বের গ্লানি টানা অনেক জাতি, আরেক জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জীবন বিলাইয়া দিয়াছে। নিগৃহীত কিংবা নিপীড়িত, নিম্নজাত-শ্রেণি-বর্ণের এইসব সদস্য নিজের অজান্তেই (অবশ্যই স্বেচ্ছায় নহে) করে ফেলেছে এক বড় কাজ। খোদ আমেরিকার কথাই যদি বলি, দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে আফ্রিকান দাসদের ভূমিকাই ছিল বড়। শুরুর দিকে কৃষিতে ইহাদের ব্যবহার করা হইত। পরবর্তীতে অন্যান্য কাজেও। ১৬১৯ সালে আফ্রিকা হইতে দাসদের আনা হইয়াছিল ভার্জিনিয়ায়। সতেরশ’ ও আঠারশ’ খ্রিষ্টাব্দ জুড়িয়া এই দাসরাই আমেরিকার অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করিয়া দিয়াছে। আমেরিকার ইতিহাসের সহিত তাই দাসেদের কথা জড়িত হইয়া আছে।
দাসেরাও কেন দাসবৃত্তিতে বাধ্য হইবে? একমাত্র কারণ না হইলেও অর্থনৈতিক বিষয়টিই ইহার বড় কারণ। আগেকার দাস প্রথায় আর্থিক বিষয়টি সরাসরি জড়িত ছিল। বর্তমানে আধুনিক দাসদের বেলায় মূল্যবোধের অবক্ষয়ও একটি কারণ। এইখানে বলা ভাল যে, নব্য দাসত্ব বলিতে সংস্থাটি যাহা বুঝাইয়াছে, তাহা হইতেছে-ঋণের দায় মিটাইবার জন্য যেমন বিনা-পারিশ্রমিকে শ্রম দিতে বাধ্য করা হয় এমন দাসত্বকে বোঝানো হইয়াছে। জোর করিয়া বিয়ে দেওয়া বা মানব-পাচারেরও শিকার হওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষকে দাসবৃত্তির আওতায় আনা হইয়াছে। ইহাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই হইতেছে শিশু। ইহার মূলে যে দারিদ্র্য কিংবা আরও গভীরে গেলে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার বিষয়টি দেখিতে পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাপী দরিদ্র দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হইবার ফলে ইহার নাগরিকরা যথাযথ নাগরিক অধিকার হইতে বঞ্চিত হইতেছে। সমাজের অবহেলিতদের দিকে তাকাইবার ফুরসত স্বল্পোন্নত দেশগুলির কর্তাব্যক্তিদের নাই। একই ভাবে বিশ্বব্যাপী সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা যায় নাই বলিয়া বিভিন্ন সময় দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক বাণিজ্যিক আলোচনাগুলিও ভেস্তে যাইতে দেখা যায়। সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন যথাযথ লক্ষ্য পূরণ করে নাই। ফলে, চরম দরিদ্র শ্রেণীকেই বরণ করিতে হইতেছে আধুনিক দাসত্ব। অভ্যন্তরীণভাবে শিক্ষা ও সাংবিধানিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এবং বাহ্যিকভাবে ধনি দেশে দরিদ্র দেশের জন্য ন্যায্য বাণিজ্য সুবিধা চালু করা গেলে নির্মূল না হইলেও নব্য দাসত্বের হাত হইতে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব হইবে।