২৫ অক্টোবর কী হবে?
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৫
কথায় বলে ‘ইতিহাস মানুষকে শিক্ষা দেয়, ইতিহাস মানুষের আগামীদিনগুলো চলতে সাহায্য করে’; আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা, গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অনেক ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়। আগামীদিনগুলো চলতে সাহায্যও করে। আবার অনেক ইতিহাস আছে নৃশংস। যা থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই? না; কোনো শিক্ষাই পাইনি, পাচ্ছিও না!
আমাদের সবার মনে আছে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের কথা। আপনাদের মতো আমারও মনে আছে। দিনটি জাতির জীবনে এক রক্তভেজা ইতিহাসের জন্ম দিয়ে গেল। এই ইতিহাস এতই বেদনার যে, তা কখনো ভুলবার নয়, মুছবারও নয়; বরং চির অমলিন এক স্মৃতিজাগানিয়া হূত্কম্পন! আগেই বলেছি ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়। সে শিক্ষা ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। তবে আমরা ভালো শিক্ষাটাই পেতে চাই। বিশ্বের ইতিহাসে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেছে বহু। ২৫ অক্টোবরকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ, বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি। তবে এই আলোচনা-সমালোচনা আর হুমকি-ধামকির বিষয়টিকে চায়ের কাপের ঝড় বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না। বড় দুই দলই নিজ নিজ অবস্থানকে আরো সংহত করার দিকে যথেষ্ট মনোযোগী। তাই বিরোধী দল যেমন ২৫ অক্টোবরের পর কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারও তাদের কথিত নৈরাজ্য দমনে কঠোর মনোভাব নিয়ে এগুচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। এরই আলামত ইতিমধ্যে দৃশ্যমানও হচ্ছে।
আর বিএনপির ডেডলাইনের অংশ হিসেবে ২৫ অক্টোবর প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রাজধানীতে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় জনমনে উদ্বেগ আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের আগেই দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি জোট সরকারের ক্ষমতার শেষ দিকে একই ভাবে দুই জোট ঢাকার রাজপথ দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মেতেছিল, মেতেছিল বাঁশের লাঠি নিয়ে উল্লাশে। ২৫ অক্টোবর পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে কার্যত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই দল। একেতো এ সরকারের ক্ষমতা শেষ অন্যদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে শক্ত অবস্থান। সবমিলিয়ে ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবি মেনে নিতে সরকারকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বিএনপি। অন্যথায় ২৫ অক্টোবর সমাবেশ থেকে লাগাতার হরতাল,অবরোধ ও অসহযোগের মতো কঠিন ও চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে বিএনপি। অন্যদিকে সরকারি দল আ.লীগ বলছে— সংবিধান মোতাবেক দলীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হবে। এ জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে সরকার। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার অধীনে হবে তা নিয়ে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমসহ গোলাপশাহ এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ওইদিন আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হন। যার চূড়ান্তরূপে পরিণত হয়েছে ওয়ান-ইলেভেন এবং দুই উদ্দিনের জগত্। আ.লীগ কী তা ভুলে গেলেন? এখন প্রধান দুই দল কতো উদ্দিনের জগতে নিয়ে যাবেন তা সৃষ্টি কর্তাই ভালো জানে।
এদিকে আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, “২৫ অক্টোবর ঢাকা শহরের কোথাও বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষ আপনাদের ধাওয়া করবে। মানুষের তোপের মুখে কোথাও যেতে পারবেন না।” এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি করে বলা হয়েছে-২৫ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশ করতে না দিলে টানা হরতালের ঘোষণা দিতে পারেন খালেদা জিয়া। (সূত্র:নূতন বার্তা, তারিখ: ১২ অক্টোবর ২০১৩) কামরুল সাহেবের কথায় মনে হচ্ছে বিরোধী দলকে আরও উসকিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিএনপির জোট সরকারের শেষের দিকে এসেও কামরুল ইসলাম, ফখরুল, জয়নুল আবেদীন ফারুকের মতো নেতারা বড় বড় কথা বলছিলেন। শেষে এসে আপনাদের কিছুই হয়নি। হয়েছে আমাদের মতো সাধারণ জনগণের। অনেক মা-বাবার বুক খালি হয়েছিল। দয়া করে আপনাদের এই তথাকথিত গণতন্ত্রকে মাটিতে পুঁতে রেখে সঠিক গণতন্ত্রকে চর্চা করুন। এতে আপনাদেরও মঙ্গল, আমাদেরও মঙ্গল।
বাংলাদেশে এখন যে রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে তার থেকে উত্তরণের উপায় কি? এ প্রশ্নের উত্তর কি আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে আছে? তবে এটি বলা যায়, এ রকমের জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে এই ব্যবস্থা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে দেয়া যায় না। এ সঙ্কটের সমাধান আমাদের বের করতেই হবে। প্রথমে আমাদের রাজনীতিবিদদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। করতে হবে বিদ্যমান রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন। গণতন্ত্রণের সঠিক রূপ রেখার বাস্তবায়ন। অন্তত দেশের জন্য হলেও স্বাধীন দেশটাকে রক্ষা করার জন্য আপনারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করুন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলছি ২৮ অক্টোবরের মতো ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা চাই গণতান্ত্রিক পন্থায়ই আমাদের দেশ পরিচালিত হোক। আমরা চাই না দেশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হোক। প্রয়োজনবোধে সংবিধান সংশোধন করে হলেও দেশ যাতে নিরাপত্তায় এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সে ব্যবস্থা করুন। প্রতি ৫ বছর পরপর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সংঘাত-নৈরাজ্য নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যবস্থা নিয়ে ধূম্রজাল দেখতে চাই না। আমরা চিরস্থায়ী নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যবস্থা দেখতে চাই। মনে রাখতে হবে মানুষের জন্য সংবিধান, কিন্তু সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। আমরা চাই রাজনীতিতে পরিবর্তন। আমরা দেখতে চাই না সংলাপের বিপরীতে সংঘাত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু জাতিগতভাবে দেশকে রক্ষার জন্য সকলের মতকে প্রাধান্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে রক্ষা করতে হবে। তা না হলে একদিন এ দেশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে পারে। যা থেকে বের হয়ে আসতে হলে নতুন করে আর এক যুদ্ধ করতে হবে আমাদের।
লেখক :গবেষক
msi.khokon@yahoo.com