রা জ নী তি

রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন?

১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার কাছে তার দলের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নাম চাইলেন এবং আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেন। আর এর ২৪ ঘন্টা পার হওয়ার আগেই ১৯ অক্টোবর দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রশাসন ২০ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঢাকা শহরে সব ধরনের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ-মানববন্ধন ইত্যাদির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলো। কেবল প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ নয়, ঘরের ভেতরেও কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একদিকে বিরোধী দলের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিলেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করাকে সরকারের স্ববিরোধী অবস্থান বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এতে সংকট সমাধানের পথ তৈরি হলো, না সংকট গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যে সরকারের এই ভূমিকায় সন্তুষ্ট হয়নি সেটা দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়েছে। রাজধানীতে রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কঠোর সমালোচনা করে মির্জা আলমগীর প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কোন ধরনের গণতন্ত্র? এ ধরনের আচরণ গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই সিদ্ধান্তকে সংবিধান পরিপন্থি বলে উল্লেখ করে মির্জা আলমগীর বলেছেন, এটা গণতন্ত্র হত্যা চক্রান্তের অংশ। ঢাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের প্রতিবাদে বিএনপি রোববার জেলায় জেলায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ পালন করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সভা-সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি করার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। এগুলো করতে না দেয়া অবশ্যই গণতন্ত্রসম্মত নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ সভা-সমাবেশ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুচিত কাজ করেছে। মাথাব্যথার দাওয়াই হিসেবে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত চরম মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে কোন প্রেক্ষাপটে পুলিশ প্রশাসন ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ হরণের মতো অপ্রিয় ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সে প্রশ্নও কেউ কেউ তুলছেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা-সমাবেশ করলে তাতে বাধা দেয়া উচিত নয়, পুলিশ সাধারণত সেটা করেও না। জনশৃঙ্খলাভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে, সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সাময়িকভাবে সভা-সমাবেশ বন্ধ করা একেবারেই অসিদ্ধ বলেই মনে করারও কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সভা-সমাবেশ-মিছিল-বিক্ষোভ করা যেমন যেকোনো দল-সংগঠন কিংবা ব্যক্তির গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনি জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিধান করাও সরকার তথা প্রশাসনের দায়িত্ব। এই দায়িত ্বপালনে অবহেলার জন্য সরকার বা প্রশাসন সমালোচিত হয়ে থাকেন। সেজন্যই সভা-সমাবেশ-বিক্ষোভের নামে দেশে ‘যুদ্ধাবস্থা’ তৈরির হুমকি দেয়া হলে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ দোষণীয় হতে পারে না বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এখন দেখা যাক কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসন রাজধানীতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন বন্ধ রাখার কথা বলেছে। ২৫ অক্টোবর দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ঢাকায় জনসমাবেশ করার ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে আশঙ্কা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ বিএনপি নেতারা অনেক আগে থেকেই ২৫ অক্টোবর নিয়ে নানা ধরনের প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। তাদের প্রচারণা থেকে কারো কারো কাছে মনে হয়েছে যে, ওইদিনই বোধহয় শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিন। ২৫ অক্টোবর থেকে দেশ নাকি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে চলবে। পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার দলীয় সমাবেশে এক উত্তেজক বক্তৃতা দেয়ার পর। সাদেক হোসেন খোকা বিএনপি আহূত ২৫ অক্টোবরের সমাবেশে দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের দা-কুড়াল-শাবল-সড়কি-খোন্তা ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানানোয় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ এর আগে লগি-বৈঠা নিয়ে বিএনপিকে মোকাবেলা করতে রাজপথে নেমেছিলো। সেজন্য খোকা সাহেব আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে দা-কুড়াল নিয়ে বিএনপি সমর্থকদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়ে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। এমনিতেই আমাদের দেশের রাজনীতি সাংঘর্ষিক। প্রধান দু’টি দলের মধ্যে আদায় কাঁচকলা সম্পর্ক। আস্থা-বিশ্বাসের চরম অভাব। সুযোগ পেলেই এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর চড়াও হয়। এই অবস্থায় কোনো দায়িত্বশীল বড় নেতা যদি প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্য কর্মী-সমর্থকদের দা-কুড়াল নিয়ে পথে নামার আহ্বান জানান তাহলে কি আগুনে ঘি ঢালা হয় না ? খোকা সাহেবের উস্কানিমূলক বক্তৃতার রেশ কাটতে না কাটতেই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরেক বক্তৃতায় বলেন, আগে কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমি-ফাইনাল খেলা হয়েছে, ২৫ অক্টোবর হবে ফাইনাল খেলা। এই কথা বলে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আসলে কি বুঝিয়েছেন? ফাইনাল খেলার অর্থ কি? ২৫ অক্টোবর তারা কি সরকারের পতন ঘটাবেন? সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হলো নির্বাচন। কিন্তু দা-কুড়ালের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতনের হুমকি কি গণতন্ত্রসম্মত? বিএনপি নেতারা তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অগণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটাবেন, উস্কানিমূলক কথা-বার্তা বলে উত্তেজনা ছড়িয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলবেন, আর সরকারের কাছে প্রত্যাশা করবেন গণতান্ত্রিক সুশীল আচরণ, এটা কেমন কথা? বিএনপির আরেক নেতা রুহুল কবির রিজভী ২৫ অক্টোবরের সমাবেশে সবাইকে পদাতিক বাহিনীর মতো যোগদানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সমাবেশে বাধা দিলে এই পদাতিক বাহিনী গোলন্দাজ বাহিনীতে পরিণত হবে। এই গোলন্দাজ বাহিনী কেবল দা-কুড়াল সজ্জিত হবে, নাকি বোমা গ্রেনেডসহ অন্য সব যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে মাঠে নামবে সেটা অবশ্য রিজভী সাহেব খোলাসা করে বলেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি নেতাদের এসব বক্তৃতা থেকে কি মনে হয় যে তারা একটি নিয়মতান্ত্রিক-শান্তিপূর্ণ সমাবেশ বা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? নাকি মনে হচ্ছে যে তারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সশস্ত্র উপায়ে শক্তি প্রয়োগের জন্য তৈরি হচ্ছেন? দেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ‘যুদ্ধের’ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামতে চাইলে সরকারের পক্ষে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা কোনো গণতান্ত্রিক সভ্য দেশেই কি প্রত্যাশিত? কেউ হয়তো বলতে পারেন বিএনপি নেতাদের এসব বক্তব্য উত্তেজনা ছড়িয়ে একদিকে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা, অন্যদিকে সরকারের উপর স্নায়ুবিক চাপ বাড়ানোর কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। এসব মেঠো বক্তৃতা সিরিয়াসভাবে ধর্তব্যের মধ্যে না নেয়াই ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটা বিএনপি নেতাদের মুখের কথা আর কোনটা মনের কথা সেটা বোঝা যাবে কীভাবে? বিএনপি নেতারা মুখে যা বলেন, সেটা বলার জন্যই বলেন, এটা যদি সত্য হয় তাহলে তো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেটাও কথার কথা বলে ধরে নিতে হয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়া যদি বিএনপির অন্তরের কথা হয়ে থাকে, এটা যদি রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি না হয় তাহলে দা-কুড়াল নিয়ে মাঠে নামা কিংবা গোলন্দাজবাহিনী হওয়া অথবা ফাইনাল খেলার ঘোষণা দেয়া রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি হবে কেন? আমরা সবাই জানি আমাদের দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে বাহ্যত কোনো সুসম্পর্ক নেই। কোনো জাতীয় ইস্যুতেই দুটি দল একমত হতে পারে না। একদল হ্যাঁ বললে অন্যদল অবশ্যই না বলবে। অথচ কি আশ্চর্য! আওয়ামী লীগের খারাপ দৃষ্টান্ত অবলীলায় অনুসরণ করে বিএনপি আবার বিএনপির অনুসৃত কুপথে চলতে দ্বিধা করে না আওয়ামী লীগ। এই দুই দল যদি একে অপরের ভালো দৃষ্টান্তগুলো অনুসরণ করতো তাহলে দেশের রাজনীতি থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে শান্তির সুবাতাস বয়ে যেত। আওয়ামী লীগের আর কিছু অনুসরণ না করলেও তাদের নিন্দিত-সমালোচিত লগি-বৈঠার রাজনীতির পথ ধরে তারা দা-কুড়ালের গোলন্দাজবাহিনীর রাজনীতি করতে চায়। লগি-বৈঠা নিয়ে পথে নেমে আওয়ামী লীগ যদি নিন্দিত হয়ে থাকে তাহলে দা-কুড়াল নিয়ে গোলন্দাজবাহিনী তৈরি করে বিএনপি কেনো প্রশংসিত হবে? ২৫ অক্টোবর নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে যে ভয়াবহ আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকার যদিও বলছে যে, ২৫ অক্টোবর কিংবা তার পর দেশে বিশেষ কিছুই ঘটবে না, কিন্তু মানুষ তাতে আশ্বস্ত হচ্ছে না। কারণ বিএনপির হুমকি-ধামকি অব্যাহত রয়েছে। এই অবস্থায় রাজধানীতে সভা-সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার গণতন্ত্র-বিরোধী কাজ করেছে বলে আমরা সমালোচনা করলেও এতে যে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে তাতে সন্দেহ নেই। তবে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদী হওয়া উচিত নয়। তাছাড়া দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সেই সঙ্কট সমাধানের পথও নয়। এটা রোগের প্রকৃত ওষুধ নয়, সাময়িক উপশমের মলম মাত্র। এখন রোগ নিরাময়ের জন্য সরকার এবং বিরোধী দলকে জরুরিভাবে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বিরোধীদলের উচিত রাজনীতির আকাশে যে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দেখা দিয়েছে তা দূর করতে ভূমিকা রাখা। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। ২৫ অক্টোবর থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবে আরো কিছু বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলে (যেমন ওই সরকারের প্রধান কে হবেন, বিরোধী দলের কয়জন সদস্য থাকবেন, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কোনোটা বিরোধীদল পাবে কিনা ইত্যাদি) অবশ্যই ভালো হতো। এসব অপূর্ণতার জন্য প্রস্তাবটি হয়তো যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নয়, তবে এটা কোনোভাবেই নাকচ করে দেয়ার মতোও নয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব ধরে সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ বিএনপি যদি কোনো না কোনো অজুহাতে হাতছাড়া করে তাহলে দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে তা হয়তো কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। দুই দলেই হয়তো এমন কেউ কেউ আছেন যারা চান না রাজনৈতিক সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক। আলোচনার দরজা বন্ধ করার অনেক অজুহাত হয়তো পাওয়া যাবে। তবে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ হলো অচলায়তন তৈরি করা নয়, ভাঙ্গা। অনৈক্যের অনেক ক্ষেত্র আছে। তবে ঐক্যসূত্র বের করাটাই হলো বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। দেশের মানুষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতাই প্রত্যাশা করে। লেখক: সাংবাদিক bibhu54@yahoo.com