ড্রোন ও বিশ্বনিরাপত্তা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৯
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টোফার হেইন্স সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি রিপোর্ট জমা দিয়াছেন। আগমী ২৫ অক্টোবর ইহা লইয়া আলোচনা অনুষ্ঠিত হইবার কথা রহিয়াছে। এই রিপোর্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ড্রোন হামলার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হইয়াছে। এমনও বলা হইতেছে যে, ইহার কারণে বিশ্বনিরাপত্তা আজ হুমকির সম্মুখীন। ড্রোন বা পাইলটবিহীন বিমান হইতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানিবার সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকরী ও সফল। যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ড্রোন হামলায় ইতোমধ্যে আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক তছনছ হইয়াছে। শুধু হামলা নহে, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধিতেও এই বিমানের জুড়ি মেলা ভার। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ ড্রোন তৈরির দিকে ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। ইতোমধ্যে ইরানও তাহার নিজস্ব মডেলের ড্রোন তৈরি করিয়াছে। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তাগত কারণে ড্রোন ব্যবহার করিবে এমন কথাও একবার শোনা গিয়াছিল। এইভাবে পারমাণবিক বোমার পর ড্রোন আলোচিত নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হইয়াছে। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ যুক্তরাষ্ট্র সফরে রহিয়াছেন। সেইখানেও দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ড্রোন হামলার বিষয়টি গুরুত্ব পাইতেছে।
প্রধানত ড্রোন হামলার টার্গেট জঙ্গিগোষ্ঠী। তবে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ইহার কারণে বহু বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনাও ঘটিতেছে। মারা যাইতেছে নারী ও শিশু। ২০০৪ সাল হইতে এই পর্যন্ত কেবল পাকিস্তানেই ৪০০ বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারাইয়াছেন। তবে সংশ্লিষ্ট বিরোধী পক্ষ অনেক সময় সামরিক অভিযান হইতে আত্মরক্ষায় সাধারণ মানুষকে মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করিয়া থাকে। শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগাররা ছিল তাহার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাহারা কৌশলগত কারণেই জনগণের মাঝে মিশিয়া থাকার চেষ্টা করে বা নিজ এলাকার সীমানায় সেইসব লোকের বসবাসকে উত্সাহিত করে। যেমন আজকাল বিভিন্ন দেশের ক্যান্টনমেন্ট এলাকাগুলিতে বেসামরিক মানুষের বসবাসকে বৈধতা প্রদান করা হইয়াছে। ইহাও রণ কৌশলের অংশ ছাড়া আর কিছু নহে। আজকাল ড্রোন হামলার মাধ্যমে আক্রান্ত দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো এবং আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করা হইতেছে এমন অভিযোগও করা হইয়া থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের প্রত্যক্ষ বা মৌন সমর্থন থাকে বলিয়া জানা যায়।
যাহা হউক, ড্রোন প্রযুক্তি সকল শক্তিমান দেশের হাতে চলিয়া যাইবে এবং ইহার কারণে বিশ্বনিরাপত্তা বিঘ্নিত হইবে এমনটি মনে করিবার কোন কারণ নাই। কেননা আমরা পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে দেখিতেছি, অধিক বলবান রাষ্ট্রগুলি একজোট হইয়া প্রতিপক্ষ শক্তি ও দেশ যাহাতে এই ধরনের অস্ত্র তৈরি বা তাহার মজুদ গড়িয়া তুলিতে না পারে, সেইজন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছে। তাহারা অনেক সময় অর্থনৈতিক অবরোধ এমনকি যুদ্ধের হুমকি প্রদানের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টিও করিতেছে। অর্থাত্ যাহারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিরোধী, ড্রোন কেবল তাহাদের জন্যই যমদূত হইয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকিবে। তাহা ছাড়া সাধারণ পরিষদে আলোচনার মাধ্যমে ড্রোন হামলার সমাধানের কোন সম্ভাবনা নাই। কেননা বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দেশগুলি এই ব্যাপারে উদ্যোগী না হইলে কোন আলোচনাই শেষপর্যন্ত সফল হইবে না। সেই আলোচনা হইবে লোক দেখানো ও হাসানোর জন্য বা আইওয়াশ মাত্র। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব যেমন গড়া সম্ভব হইতেছে না, তেমনি ড্রোনমুক্ত পৃথিবীও অকল্পনীয়। এইদিকে জাতিসংঘে সন্ত্রাস মোকাবেলা বিষয়ক বিশেষ দূত বেন এমারসনও এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট সাধারণ পরিষদে জমা দিবেন বলিয়া জানা যায়। ইতোমধ্যে তিনি ড্রোন ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনয়নের কথা বলিয়াছেন। কিন্তু যেই অস্ত্র ব্যবহারিক দিক দিয়া সফল, তাহার প্রয়োগর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হইবে তাহাই আজিকার বড় প্রশ্ন।