চাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০০
গভীর দৃষ্টি, চিন্তাশক্তি, পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্বন্ধে পূর্ণ ওয়াকিফহাল, বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সূক্ষ্ম তত্ত্বজ্ঞান রাখা এবং বাস্তবে প্রয়োগের সময় তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখাই প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার অভিব্যক্তি হলো মানবিক মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করে সেই অনুযায়ী আচরণ করা। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি কোন কাজে যত বাধা-বিপত্তি আসবে সেগুলো যেমন দৃঢ়তা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মোকাবেলা করবেন তেমনি সমসাময়িক সমস্যা ও তার সমাধান এবং অদূর ভবিষ্যতের সমস্যা সম্বন্ধেও পূর্ণ ওয়াকিফহাল থাকবেন।
জীবন বা সমাজের প্রত্যেকটি সেক্টরে যদি ঈর্ষণীয় উন্নতি করতে হয় তবে প্রজ্ঞা অতীব প্রয়োজনীয় উপাদান। যেহেতু আমাদের সমাজের বলতে গেলে সব টুকুই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে সুতরাং আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করতে গেলে প্রজ্ঞাপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার।
এই ভূ-খণ্ডে অতীতে অনেক প্রজ্ঞাবান নেতা পেয়েছি। যাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তারা এ জাতির নিকট চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাদের প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে আমরা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূ-খণ্ড পেয়েছি।
স্বাধীনতার পর থেকেই যদি পূর্ণ গণতন্ত্র চর্চা হতো তবে হয়তো আমরা মালয়েশিয়া বা উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সমপর্যায়ে যেতাম। তারপরও যেটুকু গণতন্ত্র এ জাতি পেয়েছে বিশেষ করে ১৯৯১ সালে বিচারপতি শাহবুদ্দিনের নেতৃত্বে একটি অবাধ নির্বাচনের পর থেকে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের ভিতর আর্থ-সামাজিক অবস্থার অভূতপূর্ণ উন্নতি হয়েছে। বিদেশি কর্মস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে রেমিটেন্স বেড়েছে, নতুন নতুন শিল্প কল-কারখানার মাধ্যমে রফতানি আয় বেড়েছে। বিশ্ববরেণ্য অনেক ব্যক্তির মুখে বাংলাদেশের প্রশংসা শুনছি। দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে বিশেষ করে নারী শিক্ষা। কিছুদিন আগে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন ‘বাংলাদেশে নারী শিক্ষার অগ্রগতি ভারতের চেয়ে বহুগুণ বেশি। গণতন্ত্রই যে উন্নয়নের চাবিকাঠি এটা ভালভাবে বুঝা গেছে ফখরুদ্দিন-মঈনদের দুই বছরের শাসন। প্রথমে সমর্থন থাকলেও মানুষের ঘোর কাটতে বেশি সময় লাগেনি। ব্যবসা বাণিজ্যসহ প্রত্যেকটি সেক্টর যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল তাতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল। সুতরাং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন করতে গেলে গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই।
আগামী নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে যে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে তা সাধারণ নাগরিকদের ভীত ও শংকিত করছে। বড় দুই জোট যেভাবে পরস্পর বিরোধী অবস্থান নিয়েছে তাতে আশার আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বিগত ৪ দলীয় জোটের সময়ও লক্ষ্য করা গেছে কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে অযাচিত মন্তব্য করেছেন যা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। বর্তমান মহাজোট সরকারের এই প্রবণতা আরোও বেড়েছে। সাভারের রানা প্লাজা নিয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত মন্তব্য সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ জন্য অনেকেই তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলতেও দ্বিধা করেননি। এমনই এক বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হলেন মাননীয় পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আ:লতিফ সিদ্দিকী। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার হওয়ার পরও তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে বললেন- ‘যারা হরতাল ডাকবে তাদের ঘরে গিয়ে হত্যা করতে হবে’।
এমনিতে রাজনীতিতে বিশ্বাস, আস্থা ও ভালবাসার জায়গা উঠে গেছে, তারপরও দায়িত্বশীল পদে থেকে এ রকম অনভিপ্রেত মন্তব্য রাজনীতিতে অনৈক্য ও বিভাজনের পথ প্রশস্ত করবে। বিভাজনের রাজনীতির কারণেই রাজপথ সহিংস হয়ে উঠবে, অর্থনীতিতে অশুভ শক্তির উত্থান ঘটবে যা অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি রাজনীতিবিদগণের জন্যও ক্ষতিকর।
বর্তমান রাজনৈতিক সংকট দূর করতে হলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা স্থির করতে হবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে বিরোধী জোট নির্বাচনে যাবে না। একতরফা নির্বাচনের পথে পা বাড়ালে দেশে ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে। এই সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা সর্বস্তরের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।
এ কথা স্পট বলা যায় বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি নিরেট একটি গণতান্ত্রিক দাবি। এ দাবির সাথে সর্বস্তরের মানুষের একাত্মতা রয়েছে। মানুষ চায় সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি গ্রহণ যোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হউক। কিন্তু দেখতে দেখতে পার্লামেন্ট ও সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু মানুষের আশা পূরণ হচ্ছে না।
যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাজনীতি ঘোর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাজপথ উত্তপ্তের ভয় সাধারণ মানুষের থেকে দূর হচ্ছে না।
বড় দুই জোটের নেতা তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া চাইলেই দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে। আশার কথা বিরোধী দল শেষ সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রে চরম দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে।
এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পালা। তিনি মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অর্থনৈতিক মুক্তি, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশায় একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিবেন। তার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যেন ইতিহাসের সোনালী পাতায় স্থান করে নিতে পারেন এটাই কামনা করি।
লেখক :শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়