রাজনীতি

সদিচ্ছা থাকলে সমাধান নিশ্চয়ই সম্ভব

প্রত্যাশার আলোটা জ্বলতে না জ্বলতেই দপ করে নিভে গেল। নিভে যাওয়া আলো কোনো কিছু জানান দিয়ে গেল কিনা তা জানা গেল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর ভাষণে একটি আলোবিন্দু প্রতিস্থাপন করলেন তখন আশাও সঞ্চারিত হলো অনেকটা। ভাবলাম, তিনি স্বচ্ছ ধারণা না দিলেও স্বচ্ছতা সম্পর্কে একটা আভাস দিয়েছেন যেটাতে পরিষ্কারভাবে দেখার অনেক সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগটি বিরোধীদল যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারতো। অর্থাত্ সর্বদলীয় সরকার প্রধান কে হবেন, মন্ত্রী পরিষদ কত সংখ্যক মন্ত্রী দ্বারা পরিচালিত হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রপতির এখানে কী ভূমিকা থাকবে ইত্যাদি প্রশ্ন সম্মুখে চলে এসেছিল এবং প্রশ্নের অন্তর্নিহিত রূপই ছিল সংকট সমাধানের সম্ভাব্য উপায়। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম, বিএনপি তাদের বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত জানাবার আগেই সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেয়া হলো। বিএনপি এই সুযোগটি হাতছাড়া করার পাত্র নয়। তারা বাকশাল কায়েম করার কথা, স্বৈরাচারী মনোভাবের কথা নির্দ্বিধায় বলার জন্য একটা খোলা মাঠ পেয়ে গেল। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিশ্বাস ও ভালবাসার জায়গা থেকেই সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর আশপাশের ‘আস্থাভাজন’ ব্যক্তিরা (অনেকেই তাঁদেরকে চাটুকার বলেন) হয়তো বিষয়টি ভালভাবে দেখতে পারেননি। ফলে যে নীরবতা সৃষ্টি হয়েছিল, ভাবনার উদ্রেক সৃষ্টি হয়েছিল সেটাতে সিডরের আঘাত দিয়ে আবার উস্কে দেয়া হলো। প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বললেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান থাকবেন শেখ হাসিনা। কোনো আলোচনায় বসার আগেই যদি এই সিদ্ধান্তটি হয়ে থাকে তাহলে আলোচনার সুযোগ থাকে কী করে? এমনও তো হতে পারে প্রধানমন্ত্রী এই দায়িত্ব স্বইচ্ছায় কাউকে দিয়ে দিলেন। কিন্তু কোনো কিছু ঘটার আগেই অতি উত্সাহী জ্ঞানীরা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেন। বুঝতে পারি না তাঁরা কী চান? সংঘাত উপশমের বদলে উস্কে দিলে কী ক্ষতি হয় তা বারবার দেখা সত্ত্বেও কারো বোধোদয় হচ্ছে না। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট নাগরিকদের কেউ বলছেন সরকার নিপীড়নমূলক মনোভাব নিয়েছে, কেউ বলছেন এটি স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত, কেউ বলছেন এতে সবকিছুই ঘোলাটে হয়ে গেল, কেউ বলছেন এতে সমঝোতার পরিবেশ বিপন্ন হবে। যা-ই হোক না কেন,সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক এসব কথা তো অনেক পুরনো। আওয়ামী লীগ বলেছে, বিএনপি বলেছে, জাতীয় পার্টিও বলেছে। সুতরাং সেই বিষয়টি বারবার ঘুরেফিরে আসবে কেন? তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। আপনাদের অবিশ্বাস আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক-এগার সৃষ্টি হতো না যদি বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আওয়ামী লীগ মেনে নিত। অত সংঘাত, ক্ষয়ক্ষতি দেখতে হতো না। এখন বিএনপিও তদ্রূপ আওয়ামী লীগের কাউকে প্রধান হিসেবে মেনে নিতে চাইছে না। এই অবিশ্বাস চিরকালীন হয়ে গেছে। এখান থেকে বের হতে হবে। আর তার জন্য দরকার জনগণের প্রতি আস্থা। সত্য বলতে কি, আপনাদেরকে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস দেখে-দেখে আমরাও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি আপনাদের প্রতি। ভালবাসা দেয়া-নেয়ার জায়গাটি আরো সুন্দর করুন, আরো পবিত্র করুন। সভা-সমাবেশ করতে দা-কুড়ালের হুমকি দিলে সেটা নিষিদ্ধ করায় দোষের কিছু দেখছি না। আবার শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দিলেও দোষের কিছু দেখি না। শান্তির কথাটা যখন উঠল তখন দৃঢ়ভাবেই বলি, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, এদেশের মানুষ শান্তি চায়, এদেশের মানুষ বাঁচতে চায়। তাই রাজনীতিবিদদের প্রতি আমাদের অনুরোধ— আপনারা প্রধানমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে সর্বদলীয় সরকার গঠনে ভূমিকা রাখুন। আলোচনায় বসুন, সুমিষ্ট কথায় সুমধুর সমাধান নিশ্চয়ই সম্ভব যদি সদিচ্ছা থাকে। হোক না একবার জাতির কল্যাণে জাতীয় সরকার। লেখক: কবি ও শিশু-সাহিত্যিক