[ রা জ নী তি ]
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার :বিতর্কের শেষ কোথায়
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৪
নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে যে মতপার্থক্য ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান, তা দীর্ঘদিনের। সরকারি দল সংবিধানে তাদের আমলে গৃহীত পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী নির্বাচন করতে চায়। সরকারি দলের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে, অর্থাত্ নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে বিরোধী দল বরাবর বলে আসছে, প্রয়োজনে সংবিধান পরিবর্তন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আবার চালু করতে হবে। দুই দলই নিজেদের পক্ষে অনড় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী গত ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক ভাষণে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের কথা জানালেন। ২১ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা প্রস্তাব দেন বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা তথা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে চলমান পাল্টাপাল্টি প্রস্তাবগুলো কতটুকু সংবিধান সম্মত কিংবা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তা নিয়েও এখন বিতর্ক চলছে। তবে এটা ঠিক যে, সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা কিংবা দূরত্ব যাই হোক না কেন—দুই পক্ষের প্রস্তাবেই নিজেদের চূড়ান্ত স্বার্থসিদ্ধি তথা ক্ষমতা যাওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুবিধাজনক ও অনুকূল বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব দলের সমন্বয়ে সরকার গঠন করে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলেছেন। সর্বদলীয় সরকার গঠনে প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান সব মহলে প্রশংসিত হয়। বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া পাল্টা প্রস্তাবে বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাঁচজন করে নাম দেবে। তারাই নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হবেন। ঐকমত্যের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন এ সরকারের প্রধান হবেন।
তবে পাল্টাপাল্টি প্রস্তাবের মধ্যেও একটি বিষয় পরিষ্কার যে, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতার পৃথক দুই অবস্থানের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি। ফলে পরস্পর বিরোধী প্রস্তাব নিয়ে তারা সমঝোতায় আসতে পারবে বলে মনে হয় না। অথচ দেশবাসী এখন সর্বমহলে গ্রহণীয় একটি প্রস্তাব প্রত্যাশা করেছিল। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার ভাষণে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো কথা বলেননি। এটা ঠিক যে, সংবিধানে যেভাবে বলা আছে, সেভাবেই তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন; কিন্তু সংকট সমাধানের জন্য সংবিধানের বাইরে গিয়ে কিছু কথা বলতে হবে, যা প্রধানমন্ত্রী বলেননি। তিনি আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করার কথা বলেছেন, এটিও অভিনন্দনযোগ্য। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সংবিধানসম্মত হলেও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্যের জায়গা অর্থাত্ নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান নিয়ে অস্পষ্টতাও রয়েছে। তিনি সব দলকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দিলেও নির্বাচনকালীন এ সরকারের প্রধান কে হবেন, সে সময় সংসদ বহাল থাকবে কি থাকবে না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। যেহেতু তিনি কিছু বলেননি, তাই স্বাভাবিকভাবেই সবাই ধরে নিচ্ছে যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে থেকে যাবেন এবং সংসদও বহাল থাকবে। অধিকন্তু, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গণমাধ্যমে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘সরকারপ্রধান কে হবেন, সেটি সংবিধানেই নির্ধারণ করা আছে। তাই এটি নিয়ে আলোচনার আর এখতিয়ার নেই। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মনোনীত প্রধানমন্ত্রীই সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত। কিন্তু চলমান সংঘাতমত পরিস্থিতিতে জাতির সংকট নিরসনের একমাত্র উপায়—সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় আবশ্যকতা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বস্ততা নিশ্চিত করা। তাই প্রধানমন্ত্রী যদি এ নিয়ে আলোচনার আহবান জানাতেন, তাহলেই একটি সত্যিকারের সমাধানের পথ সুগম করতো—এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
আমাদের দেশে গত দুই যুগ ধরে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে দুই নেত্রী পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রপতিসহ সব সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগ ও অপসারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করছেন। শাসন কাঠামোর এ ভারসাম্যহীনতা রাষ্ট্র পরিচালনাকেও অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে ফেলেছে। সকল ক্ষমতা তার হাতে কুক্ষিগত। নির্বাহী সকল ক্ষমতা তার হাতে; আবার সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধানও তিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে চালু হওয়া দুই দলীয় একনায়কতন্ত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার মধ্যেও আস্থার সংকট এতোটাই প্রকট যে, দলীয় লোককে রাষ্ট্রপতির আসনে বসালেও তাতে ক্ষমতার কোনো ভাগ বসাতে নারাজ তারা। অন্য মন্ত্রীদের মন্ত্রিত্ব সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন বলে তারাও প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে এক চুল নড়তে পারেন না। মূলত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই ঠিক হয় জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা আসীন থাকবেন। এমন একটি সরকারকাঠামোতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে— এটা প্রধান বিরোধী দল তো নয়, বরং সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার পক্ষে সর্বদলীয় সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী থাকার কারণে আরও বাধাহীনভাবে বিএনপির মন্ত্রীদের উপেক্ষা করা সম্ভব হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হবে। কিন্তু সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে না। তাতে বর্তমান সংসদে নেই, এমন যারা প্রার্থী হবেন, তাদের বৈষম্যের শিকার হতে হবে। বিদ্যমান সংসদের সাংসদেরা নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় বাড়তি সুবিধা পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হলে ২৫ অক্টোবরের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তাবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মপরিধি কী হবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে কিছু আসেনি।
অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রস্তাব মানলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। আর সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে সরকারি দলকে প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ বর্তমান অবস্থায় সংবিধান সংশোধনে যাবে বলে মনে হয় না। তিনি সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন সম্মানিত নাগরিককে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের কথা বললেও একটি বিষয় স্টষ্ট হয়ে উঠলো। যে, ওই দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যারা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সবাই ছিলেন অনির্বাচিত। অথচ সংবিধানে অনির্বাচিত সরকারের কোনো বিধান নেই। এই উপদেষ্টাদের অধিকাংশকেই হয়তো পাওয়া যাবে না। তবে একটি বিষয় ঠিক যে, বিদ্যমান সহিংস পরিস্থিতিতে পাল্টাপাল্টি এ প্রস্তাবে আলোচনার ক্ষেত্র অন্তত তৈরি হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় আমরা আশাবাদী হয়ে উঠলাম এ সংবাদ পেয়ে যে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষ থেকে বেগম খালেদা জিয়ার দেয়া নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাবনা সম্বলিত চিঠি ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দিয়েছেন। তবে এ ধরনের সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীতে সব ধরনের মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা কিংবা বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতির ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
আলোচনার জন্য যিনি আহ্বান জানান, তারই দায়িত্ব সেই আলোচনার ক্ষেত্র প্রশস্ত করা। ২৫ অক্টোবর সরকার ও বিরোধী দল পাল্টাপাল্টি সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এ সময়ের মধ্যে একটা সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি না হলে সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে বৈকি। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে থাকার ব্যাপারে অটল আছেন, সেহেতু নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলের সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলের কাছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে গণ্য না হওয়ায় সরকারপ্রধানের বিষয়টি নিয়ে সরকার পক্ষের আরেকটু ছাড় দেয়াটাই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে নিশ্চয়ই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়