‘যাদের করেছ অপমান...’
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩১
বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত সোমবার মধ্য রাত্রে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের অসুস্থ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে দেখিতে গিয়াছিলেন। সেখান হইতে প্রত্যাবর্তনের সময় তাঁহার নিরাপত্তায় নিয়োজিত সিএসএফ (চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স) সদস্যদের সঙ্গে দায়িত্বরত পুলিশের বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে ঘটে হাতাহাতির ঘটনাও। ইহার পরই পুলিশ সিএসএফের গাড়ি হইতে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে আটক করে। এইসময় পুলিশের বিরুদ্ধে চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার কাজে ব্যবহূত গাড়িটির জানালার কাঁচ ভাঙ্গিয়া ফেলা, গাড়ির চালককে মারধর করা এবং ছাত্রবিষয়ক ঐ নেতাকে টানিয়া বাহির করিয়া আনার অভিযোগ উঠিয়াছে। এই সমস্ত কিছুই ঘটিয়াছে মাননীয় বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি অগ্রাহ্য করিয়া।
উপরোক্ত ঘটনায় কয়েকজন আহত হইয়াছেন। অন্যদিকে গ্রেফতারের কারণে উত্তেজিত বিএনপির নেতাকর্মীরা আশেপাশের কয়েকটি গাড়ি ভাঙ্চুর করিয়াছেন বলিয়া অভিযোগ পাওয়া গিয়াছে। এইখানে একটি দলের ছাত্রবিষয়ক সম্পাদককে গ্রেফতার করা হইয়াছে ইহা বড় বিষয় নহে। বড় বিষয় হইল ইহার মাধ্যমে খোদ বিরোধী দলীয় নেতার মর্যাদার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হয় নাই। এই ধরনের ঘটনা যে কোন সময় ও যে কোন অবস্থায় অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। দুঃখজনক তো বটেই। মনে রাখা একান্ত কর্তব্য যে, একটি জাতি কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান অথবা পরিবারের সদস্যদের মাঝে যদি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ না থাকে, তাহা হইলে সেইখানে মঙ্গলজনক কিছু আশা করা যায় না। সংশ্লিষ্ট জাতি বা লোকদের কল্যাণ সাধন ও উন্নতিতে ইহা অন্যতম প্রতিবন্ধক। বিশেষত প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন দেশের নেতা-নেত্রীদের সম্মান করিতে ভুলিয়া যান, তখন সংকট আরও প্রকট ও ঘনীভূত হওয়াই স্বাভাবিক। নিজেদের ফায়দা লুটিবার লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যাহারা ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করিতে অতি উত্সাহবোধ করেন, দলীয় কর্মীর ন্যায় আচরণ করেন, এমনকি কখনও কখনও সীমালংঘন করিতেও কসুর করেন না, তখন তাহাদের উদ্দেশে আমরা বলিতে চাই এক মাঘে শীত যায় না। অতি উত্সাহীদের পরিণাম কখনই ভাল হয় না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁহার অমরগ্রন্থ গীতাঞ্জলির একটি কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘ হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!’ ক্ষমতার পটপরিবর্তনের ফলে সরকারি প্রশাসনের অতি উত্সাহীদের ভাগ্যে কী ঘটে তাহা সকলেরই জানা। তাহাদের ভুলিয়া যাওয়া উচিত নয় যে, অতীতেও এমন ধরনের বহু বাড়াবাড়ির ঘটনা ঘটিয়াছে। তাহারা তাহাদের ক্যারিয়ার বা চাকুরী জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃষ্টিপাত করিলেই এই রকম বহু দৃষ্টান্ত দেখিতে পাইবেন। সেই সঙ্গে তাহারা ইহাও দেখিতে পাইবেন যে, বাড়াবাড়ির ফল ভাল হয় নাই।
বর্তমানে এই হেমন্তে আকাশ প্রায় সময় মেঘাচ্ছন্ন থাকিতেছে। রোদ ও বৃষ্টির চলিতেছে লুকোচুরি খেলা। রাজনীতির আকাশও কিন্তু মেঘমুক্ত ও রৌদ্রকরোজ্জ্বল নহে। নিঃসীম নীলাকাশ চোখে পড়ে না। সংবাদ সম্মেলন ডাকিয়া প্রস্তাবের পর প্রস্তাব উত্থাপন, চিঠি প্রেরণ ও ফোনালাপ হইলেও টানেলে এখনও আশার আলো দেখা যাইতেছে না। অতঃপর আমাদের বলিবার কথা এই যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতোই আচরণ করিতে হইবে। সরকারি বিধি-বিধানের মধ্যেই থাকিতে হইবে। তাহা না হইলে পরিণতি যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিয়া যাইবে। কোন চানক্য আসিয়াও তাহা রোধ করিতে পারিবেন না।