আলোকপাত
নারীর ক্ষমতায়ন :একটি নিবিড় বিশ্লেষণ
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩২
বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত বিষয়সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। বহুল আলোচিত এ প্রত্যয়টিকে এখন সামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেবলমাত্র মানবেতর অবস্থা থেকে নারীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্যই নয়, পৃথিবী মুখোমুখি এমন সকল সমস্যার সমাধানে প্রধান ও প্রথম ধাপ হিসাবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কেবল আন্তর্জাতিক পরিসরে নয়, বাংলাদেশেও স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পরিসরে যে কোন নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় বা সমস্যা সমাধানে নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও দেশজুড়ে নারী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নারীর পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং অবনতি হচ্ছে। তাই এ প্রসঙ্গটির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীতে যে বিষয়গুলো সারা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে, নারীর ক্ষমতায়ন এর মধ্যে অন্যতম। মানবেতর অবস্থা থেকেই কেবল মুক্তি নয়, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় যে কোন ধরনের সমস্যার সমাধান ও নীতি-নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণকে অন্যতম অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নের অর্থই হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন একটি সুস্থ পরিবেশ থাকবে যেখানে নারী আপন মহিমায় স্বাধীন ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠবে।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, এর লক্ষ্যে নির্যাতক ও শোষকের অবস্থান থেকে পুরুষকে মুক্ত করা। সমঅধিকার ও দায়িত্বের ভিত্তিতে পুরুষেরা গৃহস্থালী ও সন্তান লালন পালনে সমানভাবে অংশগ্রহণ করবে। পাশাপাশি নারীরাও পুরুষের দায়িত্ব পালনে সমানভাবে অংশ নেবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার দ্রুত প্রসারে সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে বিশটির উপরে দেশের রাষ্ট্র প্রধান হচ্ছেন নারী। পঞ্চাশ বছর আগে মহাকাশ জয় করেছে রাশিয়ান নারী ভেলেস্তিনা। দুই নারী হিমালয়ের বুকে এদেশের পতাকা স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, দেশের কর্মজীবী মহিলার সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। বাংলাদশের দুই নারী আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেতা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় সংসদের স্পীকারেরও মহান দায়িত্ব পালন করছেন একজন যোগ্যতম নারী। লাখ লাখ নারী শ্রমিক ও কর্মী আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অফিস, আদালত, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে বাংলাদেশের নারীরা সুনামের সাথে কাজ করছেন। দেশ-বিদেশে এদেশের মেয়েরা নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। সকলেই অবগত যে সৌদি আরবে ইসলাম ধর্মের উত্পত্তি, সে দেশের মেয়েরা এখন রাজপথে গাড়ী চালাচ্ছে, ফুটবল খেলছে। ইরান, মিসর, পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের মেয়েরা খেলাধুলায় দেশের সুনাম বয়ে আনছে। আমাদের মেয়েরা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে আছে অনেকাংশে।
সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ হয় না। আবার সমাজের রক্ষণশীল মনোভাবের কিছু লোক সর্বক্ষেত্রে নারীকে অবদমিত করে রাখতে চায়। যা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
পরিশেষে বলা যায়, নারী ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে চিন্তাশীল মানুষকে আরো সজাগ হতে হবে। সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী সমাজের জীবনের বাস্তব দিকগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা এবং তার অবস্থান কোথায় বা কোথায় থাকা উচিত তা উপলব্ধি করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বায়নের যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির পরও আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়াটা দুঃখজনক। নারীদের নিরাপত্তা কোথাও নেই। কারণ নারীরা একা একা চলতে সাহস পায় না। সন্ধ্যার পর একজন নারীকে বাহিরে বের হতে হলে তাকে ঘরে ফেরা পর্যন্ত সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। আমাদের সমাজে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহিংসতা সম্বন্ধে সমাজে সচেতনতার এই অভাব পূরণে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে।
নারীর প্রতি সহিংস আচরণ সমাজে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও সামাজিক সহিংসতা যথেষ্ট পরিমাণে বেড়েছে যা মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে। মানব সমাজ জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে যতটা সভ্যই হোক না কেন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় নিতান্তই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, বঞ্চনা, বৈষম্য এগুলো মোটেই কাম্য নয়। আর অযৌক্তিক আচরণ দূর হোক এ প্রত্যাশা আমাদের। সত্যিকারার্থে নারীকে যথার্থ মূল্যায়ন না করে সুন্দর শান্তিময় সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা আশা করাটাও ঠিক হবে না। নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার, এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করে যৌক্তিক পন্থায় সবাই এগিয়ে আসুক এটাই আহ্বান।
লেখক :অধ্যক্ষ, সরকারি জিয়া মহিলা কলেজ, ফেনী