মান্না দে :হূদয়ে লেখা নাম
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫০
‘মুকুটটা তো পড়ে আছে, রাজাই শুধু নেই।’ মান্না দে, যাহার নামটাই সকল পরিচয় বহন করে, ৯৪ বত্সর বয়সে বিদায় লইলেন ‘জীবনের জলসাঘর’ হইতে। তিনি বাঙালি হইলেও চার হাজারেরও অধিক গান গাহিয়া মানুষের সুরের তন্ত্রীতে কাঁপন ধরাইয়াছেন বাংলা ছাড়াও হিন্দি, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি, কোঙ্কনি, অসমিয়া, ওড়িয়া, গুজরাটি, মারাঠিসহ বিভিন্ন ভাষায়। ভারতের ‘পদ্মশ্রী’ খেতাব, ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘দাদাসাহেব ফালকে’সহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার তিনি পাইয়াছেন বটে, কিন্তু তাঁহার সুরের মূর্চ্ছনার মূল্য সেইসব আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পুরোপুরি ধারণ করিতে পারে না।
প্রবোদচন্দ্র দে নামের যে তরুণটি চল্লিশের দশকে মুম্বাই মাতাইয়া মান্না দে হইলেন, সঙ্গীতজীবন শুরু করিবার মাত্র ছয় বত্সরের মধ্যেই যিনি তাঁহার দেশের অন্যতম বিখ্যাত শিল্পীদের মাঝে স্থান করিয়া লইলেন, তিনি যে অনেক দূর যাইবেন তাহা আরও ষাট বত্সর পূর্বেই অনুমান করিতে জ্যোতিষ শাস্ত্র জানিবার দরকার পড়িত না। সেই প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের বেঙ্গালুরুর বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন। পৃথিবীব্যাপী ছড়ানো ছিটানো তাঁহার লক্ষ কোটি ভক্ত এক্ষণে শোক ও হাহাকারের তানপুরায় কর বুলাইতেছে। তিনি যখন গাহিয়াছিলেন ‘কফি হাউসের আড্ডাটা আজ আর নেই’, তখন কি জানিতেন সেই গানখানিই কতকাল বাঁচাইয়া রাখিবে আরও কত অহর্নিশ আড্ডা? কফি হাউসের আড্ডা তাহাদের আর না থাকিলেও তাহা এখনও কত নূতন নূতন ‘কফি হাউস’তুল্য আড্ডার প্রদীপকে প্রজ্জ্বলিত রাখিতেছে, এমনকি তাহা হাইটেক প্রজন্মের ভিতরেও নূতন দ্যোতনায় নূতন সুরের জলসাঘর বসাইতে সিদ্ধহস্ত। ‘বড় একা লাগে’ এখনও কোথাও বাজিয়া উঠিলে সবচেয়ে রুক্ষ-নিরস মানুষটি আবেগ আপ্লুত হইয়া পড়ে সেই গানের সুরে, কথায়। ‘কফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালোবাসবে’ শুনিয়া কে না এইরূপ ভাবিয়া আত্মশ্লাঘায় ভুগিয়াছে যে, তাহাকেও কেহ ভালোবাসে নিভৃতে? হূদয়ে নাম লিখিলে যে সেই নাম রহিয়া যায়—এমন সহজ জানা কথাও এত সুন্দর কথা ও সুরে আর কোথায় শোনা যাইবে? এইরূপ উদাহরণ দেওয়া যাইবে প্রায় কয়েক শত। তাহা শুধু বাংলাতেই। আর হিন্দিতে তিনি যাহা গাহিয়াছেন, যাহা রাখিয়া গিয়াছেন—তাহা ওই গানের সরোবরে পদ্মফুলের ন্যায় সমুজ্জ্বল। ‘অ্যায় মেরি জোহরা জবি’, ‘দিল কা হাল শুনে দিলওয়ালা’, ‘পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে’র মতো অসংখ্য হিন্দি গানে তাঁহাকে সব প্রজন্মের মানুষ এখনও খুঁজিয়া ফেরেন। হিন্দি এবং বাংলা সিনেমার গানের ব্যাপক সাফল্যের বাহিরেও বাংলা আধুনিক গানকে মান্না দে পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন অন্য উচ্চতায়। এমন একটা সময় ছিল যখন উপমহাদেশের আধুনিক বাংলা গানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার এবং মান্না দে ছিলেন মুকুটবিহীন ত্রি-সম্রাট। প্রথম দুইজন অনেক আগেই প্রয়াত, তৃতীয় জন এইবার তিরোধান হইলেন জগতের অমোঘ নিয়মে। আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার দিক হইল, প্রতিভা থাকিলেও অসম্ভব সংগ্রাম না করিলে যে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নহে, তাহার বড় উদাহরণ তিনি; অথচ কতই না বিনয়ী, নিরহঙ্কারী।
কিংবদন্তির মৃত্যু নাই। তাঁহার গাওয়া গান এখনও অনির্বচনীয় রোমান্টিসিজমে আচ্ছন্ন করে শ্রোতাদের। সন্দেহ নাই, বহুকাল ধরিয়া এইসকল অনন্য সাধারণ গান বাজিবে নানা উত্সবে আয়োজনে। ইহা বিস্ময়ের যে, তাহার সুরের ঝরনাধারায় বাঙালিদের অবগাহন হ্রাস পায় নাই, বরং কখনও সখনও তাহা বাড়িয়াছে। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন ইহার অধিক আর কি আছে?