বাঁকা কথা, বাঁকা রাজনীতি

আজকাল বাঁকা কথা খুব চলছে। বর্তমানে কেউ আর সোজা কথা সোজা করে বলতে চায় না। সেই সুকুমার রায়ের অবাক জলপান নাটকে ঘোর গ্রীষ্মে এক পিপাসার্ত ব্যক্তি ‘জল পাই কোথায়?’ জানতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিলো, এটা জলপাইয়ের সময় নয়, কাঁচা আম চাইলে পেতে পারেন। ওই তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যখন বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, তিনি জলপাই নয়-জলের খোঁজ করছেন, তখন তাকে শুনতে হলো ‘জল চাচ্ছেন তো জল বললেই হয়, জল পাই বলবার দরকার কী? জল আর জলপাই কি এক হলো? আলু আর আলুবোখারা কি সমান? মাছও যা আর মাছরাঙাও তা-ই? বরকে কি আপনি বরকন্দাজ বলেন?’... ইত্যাদি ইত্যাদি। ভয়ানক ব্যাপার! এ অবশ্য আজকের নয়, আজ থেকে প্রায় বিরানব্বই বছর আগে সুকুমার রায় এরকম বাতচিতের বা কথোপকথনের কথা ভেবেছিলেন। পরিস্থিতিটা একবার ভাবুন; দারুণ তৃষ্ণা কাতর এক ব্যক্তি তৃষিত হূদয়ে জলের খোঁজ করছেন আর তাকে জলপাই থেকে আলুবোখারার কথা বলা হচ্ছে! আদালতে নাকি সবচেয়ে বেশি বাঁকা কথা চলে। অবশ্য আদালতের কথাবার্তার ধরন-ধারণই আলাদা। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মাননীয় বিচারক উকিল মহোদয়কে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার মক্কেলের বিরুদ্ধে কিসের অভিযোগ? উকিল সাহেব বললেন, ইওর অনার, অতি সামান্য ব্যাপার। আমার মক্কেল একটি দোকান খুলেছিলেন। বিচারক বললেন, দোকান খোলার মধ্যে দোষের কি হলো? এবার উকিল সাহেব কিছু বলার আগেই সরকারি প্রসিকিউটর বললেন, মহামান্য আদালত, সে যে দোকানটি খুলেছে সেটি ওর নিজের নয়। অর্থটা প্রাঞ্জল করে বলা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিটি একটি দোকান খুলে চুরি করতে ঢুকেছিল! বিশিষ্ট লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, বর্শার খোঁচার চাইতে কথা বা বাক্যের খোঁচা বেশি মারাত্মক। অস্ত্রের আঘাত ওষুধে সারে। কথার খোঁচা সারে না। সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। আর এ খোঁচা মারা অভ্যাস হয়ে গেলে সব কথাই বাঁকা করে বলতে ইচ্ছে হয়। ছেলেমেয়েকে ‘ওরে পড়তে বোস’ বললেই ল্যাঠা চুকে যায়। তা না করে একটু বাঁকা করে বলা হলো, ‘খেললেই কি পেট ভরবে? একটু লেখাপড়া করলে কী এমন ক্ষতি হয়।’ স্ত্রীকে ‘এক গ্লাস পানি দাও’ না বলে বলা হলো ‘এক গ্লাস পানি দেয়ার অবসর কি হবে?’ আমাদের পরিবারে, সমাজে, রাজনীতিতে সারাক্ষণ কথার তালগোল চলছে। কথার মারপ্যাঁচে কে কাকে ঘায়েল করতে পারে, কথার খোঁচায় কে কাকে কুপোকাত্ করতে পারে, যেনো তারই প্রতিযোগিতা চলছে। যন্ত্রী থেকে মন্ত্রী, শাহজাদা থেকে হারামজাদা পর্যন্ত সমানে বাঁকা কথা ঝেড়ে দিচ্ছেন। এসব বাঁকা কথার কোনো কোনোটির মানে খুঁজে পেতে, প্যাঁচ ছাড়াতে অনেক বেগ পেতে হয়। অনেক সময় তো কোন্ প্রসঙ্গে কী বলা হলো, তার মাথা মুণ্ডুই খুঁজে পাওয়া যায় না। তারপরও কিন্তু বাঁকা কথা বেশ চলছে। বিশেষ করে রাজনীতির মঞ্চে। ঈদের পর তো কথা ও কৌশলের প্যাঁচে দেশের প্রধান দুই দল একে-অপরকে প্রতিনিয়ত টেক্কা দিচ্ছে। নেতা নেত্রীরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিত্যনতুন কথা ও প্রস্তাব নিয়ে হাজির হচ্ছেন। আগামী নির্বাচন কোন্ প্রক্রিয়ায়, কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে—এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ যে প্রস্তাব দিচ্ছেন, বিএনপি এই প্রস্তাবকে কোনো রকম বিচার-বিবেচনা না করে বাতিল করে দিচ্ছে। তার পর নিজেরা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবের ঠিক বিপরীত একটা প্রস্তাব দিচ্ছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের মধ্যে থেকে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্য থেকে উভয় দল প্রস্তাবিত পাঁচ জন + পাঁচ জন ১০ জন সদস্যের সমন্বয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এক পক্ষ অন্য পক্ষের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন। আবার এক পক্ষ অন্য পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীন দলের কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। আবার ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের অন্যতম শীর্ষ নেতাকে টেলিফোন করা হচ্ছে। একে-অপরকে হুমকি দিচ্ছেন, আবার ক্ষমা করার ঘোষণাও দিচ্ছেন। এই শোনা যাচ্ছে, সব বিবাদ মিটে গেল বলে! আবার পরক্ষণেই শোনা যাচ্ছে পারস্পরিক বিবাদ এবং মতানৈক্য আরও বাড়ছে! আমরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি, কথার প্যাঁচ, রাজনীতির প্যাঁচ কখন, কীভাবে খোলে। মনে মনে অনেকেই অনেক কিছু ভাবছে। অনেকে আবার আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো করে নতুন নতুন প্রস্তাবও খাঁড়া করছেন। নিজেরাই আবার সে প্রস্তাব বাতিল করে দিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধু আশীফ এন্তাজ রবির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি লিখেছেন, আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে—তা নিয়ে দু’দলের মধ্যে বিশাল প্যাঁচ লেগেছে। গোটা দেশ জুড়ে অস্থিরতা। সবার মনে শংকা, ভয়। আমি নিজেও ভয়ের মধ্যে আছি। কারণ আমি জানি প্যাঁচটা দুই দলের বটে। কিন্তু এজন্য ভুগবে সাধারণ মানুষ। গাড়িতে আগুন দিলে, রাস্তায় বোমা ফুটলে কিংবা গুলি চললে মরবে সাধারণ মানুষ। আগুন, বোমা, গুলি এরা নিরপেক্ষ, এরা বিএনপি আওয়ামী লীগ চেনে না। মনে মনে ভাবছিলাম, সমাধান কি হতে পারে? সন্ধ্যার দিকে মাথায় একটা আইডিয়া এলো। একটা গণভোট হলে কেমন হয়? দেশবাসীকে অপশন দেয়া হলো। একটা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব আরেকটা বিরোধী দলীয় নেতার প্রস্তাব। গণভোটের মাধ্যমে দেশবাসী ঠিক করুক তারা আগামী নির্বাচনে কোন্ পদ্ধতি চায়। এই আইডিয়া আসার দুই মিনিটের মাথায় মনে হলো, কিন্তু গণভোট হবে কোন্ পদ্ধতিতে? ওটা কি ‘তত্ত্বাবধায়ক’ পদ্ধতিতে নাকি ‘নির্বাচিত’ তথা ‘সাংবিধানিক’ পদ্ধতিতে? আওয়ামী লীগ স্টাইল, নাকি বিএনপি স্টাইলে? কোন্ কায়দায়, কীভাবে হবে? এসব প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। কাজেই গণভোটের আইডিয়া বাদ। এরপর আরেকটা প্রস্তাব মাথায় এলো। ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে এক প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা যেতে পারে। আওয়ামী লীগের ১১ জন খেলোয়াড়ের সঙ্গে বিএনপির ১১ জন খেলোয়াড় খেলবে। যারা বেশি গোল দেবে, তাদের পদ্ধতিতেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রস্তাব মাথায় আসার দশ মিনিটের মধ্যে মনে হলো, এইখানেও ঘাপলা আছে। এই ম্যাচের রেফারি কে হবে? খেলা ড্র হলেই বা কী হবে? ‘ফেয়ার’ গেমের বদলে উভয় দল যদি ‘ফাউল’ গেম বেশি চর্চা করে তাহলে তা কে নিয়ন্ত্রণ করবে? খেলার ফল যদি কোন পক্ষ মেনে না নেয় তাহলেই বা কী হবে? কোন বিষয়ে কী এই নিয়ে দুই দল একমত হতে পারবে? কাজেই প্রীতি ফুটবল ম্যাচের চিন্তাও বাদ। আচ্ছা, একটা ফ্রি স্টাইল ম্যাচ হলে কেমন হয়? ঢাকার কোনো স্টেডিয়ামে। গ্যালারির দুই সাইড থেকে দুই দলের খেলোয়াড়রা নামলো। তারপর তারা যা খুশি খেলুক। ফুটবল, ক্রিকেট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কুত কুত, বউচি—যা খুশি তাই। যেই জিতবে, তাকেই আমরা মেনে নেবো। কোনো রেফারি-আম্পায়ারও লাগবে না। সমস্যা হলো, সেক্ষেত্রে দুই দলই দাবি করবে, তারা জিতেছে। তখন উপায় কি? আসলে কোন উপায় আপাতত দেখা যাচ্ছে না! এ পরিস্থিতিতে সরকারি দলের কাছে আমাদের আকুতি, দয়া করে নতুন করে ঝামেলা সৃষ্টি করবেন না। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে চলতে দিন। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনই হোক প্রশাসনের মূল মন্ত্র। তা না করে প্রশাসন নিজেই যদি দুষ্ট হয়ে যায়, কিংবা শিষ্টদের দুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করে ঝাঁপিয়ে পড়ে— তাহলে কিন্তু প্রলয় ঠেকানোর কোনো পথই আর খোলা থাকবে না! আর বিরোধী দলের কাছে আমাদের অনুরোধ, দয়া করে আর হরতাল-অবরোধ-ভাঙচুর-নৈরাজ্যের পথে যাবেন না। এসব আর কতো কাল? এখন সময় নতুন কিছু করার। এসব না করে আপনাদের উচিত সৃজনশীল ও আকর্ষণীয় কর্মসূচি উপহার দেয়া। যাতে থাকবে নতুনত্ব। মানুষ যা দেখে ভীত নয়, আনন্দিত হবে। আবার একই সঙ্গে দাবিও আদায় হবে। শুধু কথা, বায়োবীয় প্রস্তাব আর দা-কুড়ালের হুমকি না দিয়ে শরীর-চর্চা প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে। বিরোধী দলের বাছাই করা ব্যায়াম-বীররা এই শারীরিক কসরতে অংশ নিতে পারেন। বিভিন্ন টেলিভিশন বিরোধী দলের এই শরীর-চর্চা কর্মসূচি সরাসরি দেখাবে। এতে করে দেশবাসী বিরোধী দলের ‘শক্তি’ সম্পর্কে ধারণা পাবে। সরকারি দলও এতে ভীত হয়ে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে পারে। বিরোধী দল লাগাতার মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে! যেখানে কর্মসূচি হিসেবে থাকতে পারে সরকারি দলের মুণ্ডুপাত করা তাল প্রধান গানের সঙ্গে আক্রমণাত্মক নাচ, কোরিওগ্রাফি, সরকার পতনের আহবান সম্বলিত জ্বালাময়ী রাগ সঙ্গীত। সরকারি দলের বিভিন্ন নেতা নেত্রীর বক্তব্যকে প্যারোডি করে তা অভিনয় করে দেখানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন—দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখাতে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে পানির ব্যবস্থা করে একটি কৃত্রিম জোয়ারের দৃশ্য দেখানো এবং সেই জোয়ারে কিছু লোকের ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো! বিরোধী দল বিকল্প কর্মসূচি হিসেবে সারাদেশে এক যোগে প্রতিবাদী হাডুডু, ফুটবল কিংবা ক্রিকেট খেলার আয়োজন করতে পারে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা দুই ভাগ হয়ে এই সব খেলা খেলবে। ক্রীড়াবিনোদন বঞ্চিত জাতি এই খেলা দেখে মুগ্ধ হয়ে সরকারি দলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে। একই সঙ্গে দেশ নতুন নতুন বিশ্বমানের খেলোয়াড় পাবে। এই খেলোয়াড়দের সুখ্যাতির পাশাপাশি বিরোধী দলের নামও বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে। পরিশেষে সরকারি দল ও বিরোধী দলের কাছে করজোড়ে নিবেদন, আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা এমপি হবো না, মন্ত্রী হবো না, ক্ষমতার ভাগিদার হবো না, লুটেপুটে খেলেও আমরা টুঁ শব্দটি করবো না। তাহলে আমরা কেন আপনাদের অস্থির রাজনীতির বলি হবো? হে প্রিয় দুই দলের প্রিয়তম নেতা নেত্রীবৃন্দ, দয়া করে আমাদের মাফ করে দিন। আমরা ক্ষমা চাই। ঝগড়া নয়, বাঁকা কথা, বাঁকা রাজনীতি নয়, আপনাদের মধ্যে সদ্ভাব দেখতে চাই। আমরা এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে রেহাই চাই। আমাদের রেহাই দিন প্লিজ! লেখক :কলামিস্ট