সেতু নির্মাণ ও আয় বুঝিয়া ব্যয়ের গুরুত্ব
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৮
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দ্বিতীয় কুড়া সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হইয়াছে ১৫ মাস আগে। কিন্তু সেতুটি ব্যবহার করা যাইতেছে না। মানুষের এখনও ভরসা খেয়া পারাপার। তাহার কারণ সেতুটির সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয় নাই। সেতুটির এক প্রান্তের সরু রাস্তা গিয়া মিলিয়াছে পীরের ঢিলা-কোনাগাঁও সড়কে। সেইদিক দিয়া সেতুতে উঠিবার রাস্তা আছে বটে, কিন্তু অন্য প্রান্তের প্রায় পুরাটাই জলাশয়। সেইখানে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ নূতন সড়ক নির্মাণ করা হইলে তবেই সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হইবে।
উল্লেখ্য, সেতুটির কাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার (সিলেট-৬) আসনের সাংসদ সেতুটির নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। মধ্যখানে ২০০১ সালে সরকারের পালা বদলে সেতুটির নির্মাণ কাজ বন্ধ হইয়া যায়। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবার কাজ শুরু হয়। কিন্তু শেষ হয় এই সরকারের আমলে গত বত্সরের ১১ জুনে। প্রথমে যিনি সেতুটির উদ্বোধন করিয়াছিলেন বর্তমানে তিনি শিক্ষামন্ত্রী। তাহার পরও এই আধা কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কোন খবর নাই। স্থানীয় সাধারণ মানুষ এইজন্য আফসোস করিতেছেন। তাহারা অনন্যোপায় হইয়া নিজেদের পোড়া কপালকেই দোষারোপ করিতেছেন। সেতু প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। এই ব্যাপারে সওজ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলীর মন্তব্য হইল, প্রকল্পের শুরুতেই ভূমি অধিগ্রহণ না করায় সংযোগ সড়ক নিয়া জটিলতার সৃষ্টি হইয়াছে। সেই জটিলতার নিরসনে কেন এত সময় লাগিতেছে এই প্রশ্নও এখন দেখা দিয়াছে জনমনে।
এইখানে ভাবিবার বিষয় হইল, প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি সেতু নির্মাণ ১৪ বত্সরেও শেষ হইতেছে না। অবশ্য এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে নূতন নহে। একটু অনুসন্ধান করিলেই ইহার ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে এই প্রবণতার অবসান হওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগ, তত্ত্বাবধায়ক ও মহাজোট এই তিন সরকার সেতুটি নির্মাণে হাত দিয়াও কেন যথাসময়ে শেষ করিতে পারিল না এবং এখন কেন ভূমি অধিগ্রহণ নিয়া জটিলতা দেখা দিয়াছে তাহার উত্তর আমাদের অজানা নহে। মূলত বাজেট স্বল্পতার কারণেই সেতুটির এই হাল হইয়াছে। সেইখানকার অধিবাসীদের দুর্ভাগ্য বরণ করিতে হইতেছে। ইহার জন্য দায়ী আসলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও জনসচেতনতার অভাব। আমাদের দেশে নির্বাচনের আগে ও পরে শত শত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। যেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় তাহাও দেওয়া হয়। এইক্ষেত্রে আর্থিক সঙ্গতির কথা বিবেচনা করা হয় কদাচিত্। যেহেতু জনগণের মধ্যে অশিক্ষা ও নানা কারণে সচেতনতা কম, সেইজন্য তাহারা অবাস্তব এইসব প্রতিশ্রুতি নিয়া মাথা ঘামান না। বরং যিনি প্রতিশ্রুতি দিয়া মুখে ফেনা উঠাইতে পারেন, নির্বাচনে তাহারই জয় হয়। দেখা যায়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত বাজেট হইতে সর্বোচ্চ ৫০টি সেতু বা কালভার্ট নির্মাণ করিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির কারণে এমপিরা শত শত সেতু নির্মাণের বায়না নিয়া হাজির হন। শেষমেষ সবার মুখ রক্ষা করিতে অল্প অল্প করিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়। অনেক সময় যেই টাকা দেওয়া হয় তাহাতে সেই সেতুর এক-চতুর্থাংশ কাজও শেষ হইতে পারে না। ইহাই সবকিছুতে জটিলতা সৃষ্টি ও কালক্ষেপণের মূল কারণ। সর্বোপরি আছে দুর্নীতি ও অনিয়ম।
এইভাবে বিনিয়োগকৃত অর্থের তেমন কোন উপযোগিতা মেলে না বা সুবিধা পাইতে বিলম্ব হয়। অনেক সময় ইহার কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক কারণেই এক সরকার আসিয়া অন্য সরকারের গৃহীত প্রকল্প বন্ধ করিয়া দেয়। কেননা তাহাদের এজেন্ডা হয় ভিন্ন। অন্যের প্রতিশ্রুতি পূরণের চাইতে নিজেদের দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রাধান্য পায়। এই পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলে জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সচেতন হইতে হইবে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘কাট ইউর কোট একর্ডিং টু ইউর ক্লথ’ অর্থাত্ আয় বুঝিয়া ব্যয় করো। এই কথা ব্যক্তিগত জীবনে যেমন তেমনি সামষ্টিক ও জাতীয় জীবনেও প্রযোজ্য। বিদেশি ঋণের দায়ভার হইতে মুক্তির লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কৃচ্ছ্রতা সাধনের নীতি গ্রহণের কারণেই সমপ্রতি দেশটিতে বাজেট জটিলতা ও তাহার প্রতিক্রিয়ায় এক প্রকারের প্রশাসনিক অচলাবস্থা দেখা যায়। বস্তুত, ঋণ করিয়া ঘি খাওয়ার দিন শেষ। তাই শুধু ভোট পাওয়ার আশায় মিথ্যা ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দিন ফুরাইয়া আসিতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। সারাদেশে সেতু নির্মাণে সরকারকে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করিতে হইবে। আমরা অবিলম্বে উক্ত সেতুটির সংযোগ সড়ক নির্মাণের দাবি জানাই।