স্মরণ
কিংবদন্তী শিল্পী মান্না দে
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৫৯
প্রবাদ প্রতিম প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আমাদের প্রিয় মান্নাদে চলে গেছেন না ফেরার দেশে চব্বিশে অক্টোবর ভোর তিনটা পঞ্চাশ মিনিটে ব্যাঙ্গালুরুর নারায়ণ হাসপাতালে। আমরা শোকাহত, নির্বাক, স্তব্ধ। প্রায় সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তার একটি গানের কথা মনে পড়ে ‘অভিনন্দন নয়, প্রশংসা নয়, নয় কোন সংবর্ধনা, মানুষের ভালবাসা পেতে চাই আমি, চাই শুধু শুভ কামনা’। সংগীত প্রিয় লোকটির যারা গান শুনেছেন সবাই কেঁদেছেন তার মৃত্যুতে। আমার পরম সৌভাগ্য যে, ১৯৯৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে তাকে দেখার, কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুকে জড়িয়ে ধরার এবং কয়েক মিনিট তাকে পাওয়ার আনন্দে বোবা হয়ে যাওয়ার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। সার্কের অনুষ্ঠান বলে প্রথমেই বাংলাদেশ পরিবেশন করল, পরে ভারত এর নাম ঘোষণায় এলো। স্টেজের পর্দা নামল। ঠাণ্ডা মেজাজের সব বাদ্যযন্ত্র এলো। পর্দার আড়াল থেকেই বুঝতে পারছিলাম, পর্দা সরতেই প্রণামের ভঙ্গিতে মাথায় চিরায়িত টুপি কোর্ট পরিহিত সুরের কিংবদন্তী ঢুকলেন। সে যে কি দৃশ্য লিখে বোঝানো যাবে না। কোন শিল্পীর প্রতি এত ভক্তি শ্রদ্ধা আমি আর কখনও দেখিনি। মান্নাদে শুরুতেই একটি হিন্দি গান ধরলেন। গান শেষ হতেই সবাই শ্লোগানের মত করে কফি হাউজ, কফি হাউজ করে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু মান্নাদে বললেন, না না না আমি আজ কফি হাউজ করব না, অন্য হাউজে কত কফি আছে আপনাদের শুনাব। বলেই পৌষের কাছাকাছি রোদ মাথা সেই দিন, সে আমার ছোট বোন, ক ফোঁটা চোখের জল, সবাইতো সুখি হতে চায় ইত্যাদি গেয়ে চললেন। মান্নাদে নিজেই ঘোষণা দিলেন দেখুন সার্কের অনুষ্ঠান সময়ের সীমাবদ্ধতা আছে।
সেদিন মান্নাদে প্রায় দশটি গান পরিবেশন করেছিলেন। ভারত পর্ব শেষ হতেই নেপাল। ততক্ষণে আমার নতুন ইচ্ছে যদি মান্নাদেকে একটু ছুঁয়ে দেখতে পারতাম। কিন্তু ঝামেলা করলো নিরাপত্তা প্রহরীরা। ওরা কোন পুরুষকে নিচের দিকে নামতে দিচ্ছে না। ভিআইপিরা সব নিচের সারিতে। তবে মেয়েরা নামতে পারছে। দুবার চেষ্টা করে আটকে গেছি। পরে দেখি বেশ সুন্দরী সাদাপোশাকের একটি টিনএজের মেয়ে নিচের দিকে নামবে বলে আমার দিকে আসছে। ভাবলাম মেয়েটি আমাকে ক্রস করলে পিছন হতে নিরাপত্তা কর্মীদের দেখিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করলে মেয়েটি বুঝবে না অথচ নিরাপত্তা কর্মীরা ভাববে আমি মেয়েটির সঙ্গের কেউ। করলামও তাই। মেয়েটির পিছে পিছে নেমে পড়লাম। আর্টিস্ট রুমে গিয়ে দেখি আমাদের আর এক নক্ষত্র রুনা লায়লা দাঁড়িয়ে যন্ত্রশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপা মান্নাদে কোথায়? উনি আমার গালের চিবুক এমনশক্ত করে ধরলেন আর বললেন, এই ছেলে তুমি মান্নাদের পাগল হতে পারো আমাদের হতে পার না? রুনা লায়লা আপা বললেন, যাও মান্নাদে এইমাত্র বেরিয়ে গেছেন। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের পশ্চিম পাশে দৌড়ে গিয়ে দেখি পাজেরো জীপের সামনে মান্নাদে গাড়িতে উঠে দরজা লাগাচ্ছেন। টান দিয়ে দরজা খুলে ফেললাম। উনার পেটের বরাবর মাথা রেখে জড়িয়ে ধরলাম। তিন/চার মিনিট বোবা ছিলাম কোন কথা বলতে পারিনি। আমি বুঝতে পারছি জীবন্ত কিংবদন্তী মান্না দে আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। মাথা এবং পিঠে হাত বুলাচ্ছেন আর বলছেন হ্যাঁ বলো। কথা বলো। আমি পকেট হতে উনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা গান পড়ে শুনালাম, এ গান খানি যদি হয় মোর জীবনের শেষ যতই বাহবা পাই যতই বেশ...। উনি পুরা গানটি পড়লেন। বললেন, তুমি গান লেখ, খুব ভালো খুব ভালো। উনি আমার মত একজন নগণ্য ভক্তকে আর্শিবাদ করলেন, তুমি গান লিখে যাও একদিন অনেক বড় গীতিকার হবে। সেই আশির্বাদটুকু মাথায় নিয়ে লিখে চলেছি। জানি না সময় নিরূপণ করবে, তবে ঐ কয়েক মিনিটে উনার যে দরদ দেখেছি তা কখনো ভুলার নয়।
লেখক :তরুণ গীতিকার
obaidulhaqueakash@yahoo.com