সংলাপ ও আলোচনায় অবসান হোক প্রতিহিংসার রাজনীতি

যে উত্কণ্ঠা এবং সংশয় নিয়ে সাধারণ মানুষ এবার ঈদে বাড়ি গিয়েছিল সেই উত্কণ্ঠা এবং সংশয়ের এখনও শেষ হয়নি। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশ যে গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে তা আপাতত সমাধানের ইঙ্গিত তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ তেমনি বিরোধী দল বিএনপি নেত্রীও ফের স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে তিনি আবারো আহবান জানিয়েছেন। ঈদের পরপরই প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এমন খবর শুনে সবাই সংকট নিরসন হচ্ছে ভেবে আশান্বিত হন। মানুষ হয়তো ভেবে নিয়েছিল যে, এবার রাজনীতির আকাশ থেকে দুর্যোগের কাল মেঘ কেটে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে যে সংকট অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থা বিরাজ করছে সেটা দূরীভূত হয়ে একটা নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করবে দেশ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার পর অনেকের মনে হলো অনেকটা অস্পষ্ট একটি ভাষণ। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ প্রধান বিরোধী দল কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত ভাষণের মূলকথা ছিল, সবদলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য করার জন্য নাম আহবান। এ ভাষণে তিনি বিরোধীদলের দাবি-দাওয়া সংসদে এসে বলার জন্য এবং প্রয়োজনে নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে আবারো মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের অনুরোধ করেন। বিরোধীদলের যে দাবি তা হলো- নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। যেখানে মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। যে দাবিটা মূলত আওয়ামী লীগেরই। যা তারা এর আগে বিরোধী দলে থাকার সময় করেছিল। সেই একই দাবি করছে বিরোধীদল তথা বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট। যে কথা সর্বশেষ ২৫ অক্টোবর ১৮ দলীয় জোট আয়োজিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় আবারো পুনর্ব্যক্ত করেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তিনি আবারো বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তারা কোনো ধরনের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। একইভাবে আওয়ামী লীগ একতরফা কোনো নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে জনগণ তা প্রতিহত করবে। নির্বাচন কমিশনকেও এ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের পথ থেকে সরে আসার আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের ওপর দেশের বিশিষ্টজনেরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কেউ কেউ বলেছেন, যে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিশ্চিত হয়নি। সুষ্ঠু সমাধানের আগ্রহ যদি সরকার না দেখান তাহলে সংকট আরো ঘনীভূত হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রশ্নে উভয় দলের মধ্যে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে এবং একটা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু- গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ হবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার ভারত সফর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। আসলে মূল বিতর্কটা হলো- একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে। পঞ্চদশ সংশোধনী আনার পর থেকেই বিরোধী দল উদাত্ত কণ্ঠে বলে আসছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বাইরে তারা কোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। বিরোধী দল এখনও সেই একই দাবিতে অনড় এবং তারা এ বিষয়টি নিয়ে যেমন সরকারের কাছে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে তেমনি তারা আলোচনারও আহবান জানাচ্ছেন। কিন্তু একইভাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা সংবিধানের বাইরে একটুও যাবেন না। জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে সরকার এবং বিরোধী দল এখন এক অপরের মুখোমুখি। এখন পর্যন্ত সমস্যা সমাধানের সুন্দর কোনো পথ প্রস্তুত হয়নি। ফলে রাজপথই উতপ্ত হয়ে উঠছে। যদিও দেশের সাধারণ জনগণ কায়মনো বাক্যে শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করছেন। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি ছোট-খাটো ইস্যুতেও সরকার কেন জানি বেশিমাত্রায় অসহিষ্ণু আচরণ করছে। প্রতিদিনই রাজনৈতিক গণধরপাকড় চলছে। সেই তুলনায় বিরোধী দল সহিষ্ণু পথেই রয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে দু’ধরনের প্রস্তাব করায় বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণ তাদের ভোটাধিকার সুষ্ঠু-সুন্দর মতো প্রয়োগ করতে পারবে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন। তবে এটি ঠিক এখন যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান দুই নেত্রীর হাতেই। প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন তিনি দেশের জন্যে সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে প্রস্তুত তখন আমরা আশান্বিত হই। একইভাবে বিরোধী দলীয় নেত্রী যখন বলেন আলোচনার পথ উন্মুক্ত তখন আমরা রাজনীতিতে সুন্দরের প্রতিধ্বনি শুনি। আসলে এই মুহূর্তে প্রয়োজন দুটি দলের মাঝে সংলাপ এবং সমস্যা সমাধানে নিরন্তর আলোচনা। আমরা মনে করি সময়ের সাথে সাথে মানুষের মন অনেক বদলে গেছে। সব মানুষই এখন শান্তি এবং সুন্দরের পক্ষে- কেউই রাজনৈতিক সহিংসতার পক্ষে নন। সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের বিভিন্ন জায়গাতে যে অভিব্যক্তি শুনি তাতে করে বুঝি কেউই সহিংসতা চান না। আমাদের দুই নেত্রী সবসময় জনগণের কথা বলেন। কিন্তু এটাইতো সত্যি জনগণ কখনই সহিংসতার পক্ষে নয়-জনগণ বরাবরই শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার পক্ষে। মিডিয়াতে সাধারণ জনগণকে বিনয়ের সাথে বলতে শুনছি যে অবস্থা তৈরি হয়েছে তার অবসান হোক এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হোক। বাংলাদেশের জনগণ সত্যি একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্যে অপেক্ষা করছে। সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই কথিত কোনো নির্বাচন দেখতে কিম্বা অংশগ্রহণ করতে চায় না। এরকম কিছু ঘটলে বা ঘটানোর চেষ্টা করা হলে তারাই ইতিহাসে ভীষণরকম নিন্দিত হবে এবং সে দায় বা অপকর্মের জবাবদিহিতা একদিন তাদেরকে করতেই হবে। সবশেষে বলবো, সংবিধানের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্র হরণ নয়, জনগণের ভোটের অধিকার কলঙ্কিত নয়, জনগণের মধ্যে আতঙ্ক-উদ্বেগ তৈরি নয় -জনগণের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেয়ার সব ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। নিশ্চিত করা হোক মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার। দেশের জনগণ কেবলই শান্তিতে নিরাপদে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায়। জনগণের সেই আশা-আকাঙ্খা পূরণে দুই নেত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে — অবসান হোক সকল প্রতিহিংসার রাজনীতি। লেখক: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ই-মেইল : kirondebate@gmail.com