কওমি মাদ্রাসা :স্বীকৃতি চাই নিয়ন্ত্রণ নহে

মেয়াদের শেষ সময়ে আসিয়া সরকার অবশেষে কওমি মাদ্রাসার ‘সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যে’র বিধান করিতে যাইতেছে। এই জন্য সাত সদস্যের একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। এই কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসাবে থাকিবেন কওমি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একজন শীর্ষ আলেম। সরকার তাহাকে নিয়োগ প্রদান করিবেন। পদাধিকার বলে পাঁচটি কওমি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানরা সদস্য নিযুক্ত হইবেন। আর একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হইবে যিনি যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার অধিকারী। চলতি সংসদ অধিবেশনেই সরকারের এই সংক্রান্ত বিল পাস করিবার পরিকল্পনা রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়। বিলটির শিরোনাম ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন -২০১৩’। গত বত্সর ১৫ এপ্রিল সরকার ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে। কমিশনের সুপারিশের আলোকেই নূতন আইন করা হইতেছে। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া প্রকাশিত হইয়াছে। ইহার পরই এই ব্যাপারে প্রতিবাদ উঠিতে শুরু করিয়াছে। কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ আলেম ও সমন্বয়ক সংস্থা বেফাকুল মাদারিসের চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফী ইহার বিরোধিতা করিয়া বলিয়াছেন যে, ইহার ফলে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধ্বংস হইবে। তিনি ইহাকে সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ বলিয়া দাবি করিয়াছেন। উল্লেখ্য, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁহাকেই করা হয় এবং ইহার কো-চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন শোলাকিয়া ঈদগাহের পেশ ইমাম আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান ও বিবিধ কারণে সরকারের বিরাগভাজন হইয়া উঠিবার কারণে তিনি কমিশনের কাজে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কওমি মাদ্রাসা আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা হইতে অনেক দিক দিয়াই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সম্পূর্ণ বেসরকারি ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং সিলেবাসও আলাদা। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সারাদেশে বেফাকুল মাদারিসের নিবন্ধনভুক্ত কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ১৫ হাজার। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪০ লক্ষ। শিক্ষকের সংখ্যা ২ লক্ষ। তবে ইহার বাহিরেও অনেক কওমি মাদ্রাসার অস্তিত্ব আছে। এই লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর প্রধান সমস্যা হইল, তাহাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কোন সরকারি স্বীকৃতি নাই। ফলে তাহাদের কর্মসংস্থানের পরিধি সীমিত। গত চার দলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষপ্রান্তে কওমি মাদ্রাসা সনদের স্বীকৃতির ওপর একটি সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়। উক্ত গেজেটে দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হয়। কিন্তু তাহা সর্বত্র কার্যকরী হয় নাই। এইবারও খসড়া আইনে এই মূল বিষয়টিকেই এড়াইয়া যাওয়া হইয়াছে বলিয়া দাবি করা হইতেছে। উপরোক্ত প্রস্তাবিত আইনটির ৬ নং ধারার ৩ অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছে যে, কোন সদস্যের (কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ) মেয়াদ শেষ হইবার পূর্বেও সরকার যে কোন সময় তাঁহাকে তাঁহার দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি প্রদান করিতে পারিবেন। ইহাতে কওমি মাদ্রাসাগুলিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দলীয় ও অনুগত লোক নিয়োগের পথ প্রশস্ত হইবে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। তাহাছাড়া ১০ নং ধারার ৭ অনুচ্ছেদে বলা হইয়াছে, ‘ কর্তৃপক্ষের প্রতিটি সভার কার্যবিবরণী ও গৃহীত সিদ্ধান্তের অনুলিপি সরকারের নিকট প্রেরণ করিতে হইবে, এবং উক্ত সিদ্ধান্ত এই আইন বা জাতীয় শিক্ষানীতির পরিপন্থি হইলে উহা বাতিল বা সংশোধন করিবার জন্য বা কার্যকর না করিবার জন্য সরকার নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে এবং তদানুসারে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’ সেক্যুলার শিক্ষার ঘোরবিরোধী কওমি মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট কাহারও পক্ষে ইহা না মানাই স্বাভাবিক। ভারত ও পাকিস্তানে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি আছে, কিন্তু কোনরূপ সরকারি নিয়ন্ত্রণ নাই। বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসা মহল তাহাই চাহিতেছেন। এমনকি তাহারা এইজন্য সরকারি অনুদান বা সাহায্য-সহযোগিতার মুখাপেক্ষী নহেন। যদিও কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস যুগোপযোগী করা ও ইসলামের আলোকেই প্রয়োজনীয় সংস্কারের কোন বিকল্প নাই। আলিয়া মাদ্রাসার ওপর সরকারের মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণারোপের কারণে অনেকেই এখন ইহার সমালোচনা করিতেছেন। সেইখানকার পরিবেশগত কারণে সাধারণ শিক্ষার প্রভাব বাড়িতেছে। এমতাবস্থায় ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পটভূমিতে ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারী কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা ধরিয়া রাখাই বাঞ্ছনীয়। ব্রিটিশ আমলে এই মাদ্রাসাগুলিকে বলা হইত খারিজি (অর্থাত্ সরকারি নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত) মাদ্রাসা। শেষ মুহূর্তে কোন বিতর্কিত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করিবার কোন মানে হয় না। আমরা আশা করি, এ সংক্রান্ত বিলটি সংসদে পাস হইলে তাহাতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের আকাঙ্ক্ষা ও স্বতন্ত্র মূল্যবোধেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিবে।