দুই নেত্রীর ফোনালাপ
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের দাবি দীর্ঘ দিনের। সরকারি ও বিরোধী দলের রাজনীতিবিদরা পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত না হয়ে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করবেন— এমন প্রত্যাশা জনগণের; কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে সহনশীলতা ও ধৈর্যের বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়। তারা সর্বদা মার মার কাট কাটে বিশ্বাসী। ফলে স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি এদেশে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে হানাহানি, সংঘাত, হরতাল, জ্বালাও-পোড়াওর ঘটনা ঘটলেও মুদ্রার ওপর পিঠে আর একটি চিত্র: বিরোধী দলের সংসদ থেকে পদত্যাগ না করা, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের অনুমতি প্রদান ইত্যাদি রয়েছে যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে বলে আমরা আশা করি। বিন্দু বিন্দু জল এক সময় যেমন মহাসমুদ্র সৃষ্টি করে; তেমনি আমরাও বিশ্বাস করতে চাই যে, রাজনীতিতে এত নেতিবাচক দিকের মধ্যে যে অল্প কিছু ইতিবাচক শিষ্টাচারের প্রচলন হচ্ছে, তা একদা এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে। সম্প্রতি নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ফোন করার মাধ্যমেও ওই ইতিবাচক সংস্কৃতি আরো পোক্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি।
এই ফোনালাপের মাধ্যমেই দেশ সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করি; কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বও কম নয়। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর বাইরে ওই দুই দলের বড়, ছোট, মাঝারি পাতি নেতা থেকে কর্মী সবাইকে সংযত হতে হবে। যে সব মন্ত্রী বেফাঁস কথা বলে এতদিন সরকারকে ডুবিয়েছেন তাদেরকেও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে হবে। প্রয়োজনবোধে সংলাপ বাধাগ্রস্ত হয় এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে মিডিয়াকেও যাতে এমন কোন কথা বলা না হয়, এমন কোন সংবাদ প্রকাশিত না হয় অথবা টকশোতে এমন টক আলাপ না হয়; যাতে দুই প্রধান দলের মধ্যে দূরত্ব কমার বদলে বেড়ে যায়। সংলাপের বদলে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়। আমাদের সবারই উচিত, দুই প্রধান দলের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা।
এদেশের সব মানুষই প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রী সংলাপে বসুক, সমঝোতায় পৌঁছাক, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক— এমনটি চায় বলে আমি বিশ্বাস করতে চাই; কিন্তু এর বাইরেও যে একেবারে কেউ নেই আমি এমন কথা বলতে চাইছি না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী যাতে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারেন, সংলাপের বদলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হোক সেই চেষ্টাও কোন ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী করতে পারে। আমাদের সেই দিকে সর্তক দৃষ্টি রাখা উচিত। বাংলাদেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে যারা ফায়দা লুটতে চায় তারা নিষ্ক্রিয় থাকবে এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। তারা নানা অজুহাতে সংলাপের পরিবেশকে বিঘ্নিত করতে পারে। সমঝোতায় অন্তরায় হতে পারে। স্বাধীনতা বিরোধী ওই চক্রটির অপতত্পরতা বিষয়ে গণমাধ্যমগুলোকে তাই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। দেশবাসীকে সত্য ঘটনা অবহিত করতে হবে।
সংলাপ শুরুর বিষয়ে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক থাকলেও একটি বিষয় অর্থাত্ জামায়াত প্রসঙ্গ এক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ সরকারের সাথে যদি আপসরফার কোন প্রশ্ন আসে, ছাড় দেয়ার দরকার হয়, সেখানে ১৮ দলের সব নেতার সম্মতিতেই বিরোধী দলীয় নেত্রীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে শুধু বিএনপি একা আন্দোলন করছে না। এই আন্দোলন হচ্ছে জোটবদ্ধভাবে। বিরোধী দলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধে জোট নেতাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ছাড়া সিদ্ধান্ত জানাতে পারেননি। তেমনি আলোচনায় ছাড় দেয়ার ক্ষেত্রেও জোটের নেতাদের সাথে আলোচনা ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিরোধী দলীয় নেত্রীর জন্য সত্যিই কঠিন হবে। নীতিগত প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী সরকার প্রশ্নে ছাড় দিতে সম্মত হলেও জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে ছাড় দিবে বলে মনে হয় না। তারা জামায়াতে ইসলামীকে আলোচনায় সম্পূক্ত করতে চাইবে না। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর ফোনালাপের পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে যা বলেছেন তা থেকে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন যে, জামায়াতে ইসলামীকে সংলাপে আহ্বান জানানো হবে না; কিন্তু এখন যদি বিরোধী দলীয় নেত্রী ১৮ দলের নেতাদের ছাড়া গণভবনের দাওয়াতে আসতে না চান। তখন কী হবে?
বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে জামায়াত প্রশ্নে বির্তক না তুলে বিএনপি এককভাবেই সরকারের সাথে আলোচনা করুক এবং সরকারের সাথে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে ১৮ দলীয় জোটকে অবহিত করুক। প্রয়োজনে তাদের সাথে পৃথকভাবে প্রতিটি বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারের সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো যেতে পারে। যাতে শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি না হয়; কিন্তু কোন ইস্যুতেই যেন সংলাপের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা নষ্ট না হয়। বিরোধী দলীয় নেত্রীর ৬০ ঘণ্টা হরতালের আল্টিমেটাম দেয়ার পর এদেশের উত্কণ্ঠিত প্রতিটি মানুষ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ফোন করার অপেক্ষায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ফোনের পর এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপের পর তারা এখন আশায় বুক বেঁধেছেন যে, হরতাল অবরোধের যাঁতা কলে আর তাদেরকে পিষ্ট হতে হবে না। এখন যদি কোন কারণে শেষ পর্যন্ত সেই বহু কাঙ্ক্ষিত সংলাপ না হয়; তবে জনগণ এর জন্য সরকারি দলকে যতটুকু দায়ী করবে তার চেয়ে বেশি দায়ী করবে বিরোধী দলকে।
পরিশেষে, আমরা আশাবাদী হতে চাই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী দেশ ও জনগণের স্বার্থে সংলাপের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাবেন। আর এর মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্তস্নাত সোনার বাংলা আমার প্রিয় জন্মভূমি গভীর সংকট থেকে রক্ষা পাবে। জয় হবে গণতন্ত্রের।
লেখক :শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
salah.sakender@gmail.com