[ রা জ নী তি ]

ফোনালাপ :রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার প্রত্যাশা

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে মোবাইলে ফোন করেছেন। তাদের মধ্যে ৩৭ মিনিট ফোনালাপ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় গণভবনে নৈশভোজে আমন্ত্রণ এবং এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে তাঁর আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেননি, তবে তিনি ৩ দিনের ডাকা হরতাল শেষে ২৯ তারিখের পর আলোচনায় পুনরায় ডাকা হলে কথা বলেছেন বলে তাঁর প্রেসসচিব মারুফ কামাল সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন। পরে আমরা টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টেপ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের তিনদিনের হরতাল প্রত্যাহারের জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে বারবার অনুরোধ করেছেন। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ রক্ষা না করে হরতাল অব্যাহত রাখার কথাই বলেছেন। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপের সংবাদ জানার পর জনগণের মধ্যে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, হরতালটি একেবারেই শর্তসাপেক্ষে ছিল তাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের পর সেই হরতালটি বিরোধী দলীয় নেত্রী প্রত্যাহার করে নেবেন। কিন্তু হরতালটি প্রত্যাহার না করার কথা গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর জনমনে ব্যাপক হতাশা নেমে আসে। অধিকন্তু এবারে হরতালের আগের দিন ঢাকায় মন্ত্রী, বিচারপতি, সিইসি, মিডিয়াসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ব্যাপক বোমাবাজি, সংঘটিত হওয়ায় এবং মানুষ হত্যা গণপরিবহনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় দেশব্যাপী বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সন্ত্রাসের এমন রূপটি দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতির জন্য অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব বোমাবাজি বেশ সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে তার বেশ কিছু নমুনা হরতালের তিন দিন দেশব্যাপী দেখা গেছে। তবে দুই নেত্রীর ফোনালাপটি দেশব্যাপী তাত্ক্ষণিকভাবে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। সকলেই যেহেতু সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছিল যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ থেকেই আলাপ-আলোচনার সূচিত ধারাটি বেগবান করতে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ফোন করবেন তাই সকলের মধ্যেই সেই টেলিফোনটির দেখার আগ্রহ এবং অপেক্ষাই অধিক পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিও এরমধ্যে দুই দলের সাধারণ সম্পাদক এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পর্যায়ে ফোনালাপ ক’দিন আগেই হয়েছিল, সংলাপ শুরুর তাগিদ বা আগ্রহের কথা বলা হচ্ছিল, পরস্পরবিরোধী হলেও দুই নেত্রীর দু’টো প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে, বিষয়টি দুই মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদক পর্যায়েই তা সীমাবদ্ধ ছিল না, সংসদেও আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন করার আগেই দুই দলের মধ্যে আলোচনার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফোনালাপটি এর গতিকে ত্বরান্বিত করবে- এমনটিই আশা করা হচ্ছিল। তবে ফোনালাপটি নিয়ে যে ধরনের অপেক্ষা, আগ্রহ এবং কথাবার্তা তা সংলাপের সূচিত মূল প্রক্রিয়াকে কিছুটা আড়ালে ফেলে দেয়ার একটি ধারণা তৈরি করেছে মাত্র। যা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ সূচিত সংলাপ প্রক্রিয়ায় বাড়তি উপাদান তৈরি করেছে এটি নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। তবে টেলিফোনটির দেরির কথা তুলে সংলাপের সূচিত ধারাকে অবজ্ঞা করা উচিত হবে না। গণমাধ্যমগুলো কখনো কখনো এমন একটি ধারণা তৈরিতে অবদান রাখলেও রাজনীতির গভীর বিশ্লেষকদের এ ধরনের বিষয়গুলোর ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হওয়া যথাযথ হবে না। দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সর্বত্র তেমন কথাবার্তারই ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ফোন করার বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি। মানুষ কিছুটা হতাশ হয়েছে শর্তযুক্ত হরতালটি উক্ত টেলিফোনে আলাপ এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পরও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রত্যাহার করার মনোভাব না দেখানোর ফলে। যদি বিরোধী দল তেমন মনোভাব প্রদর্শন করতো তাহলে সংলাপের গতি অনেক বেশি লাভ করতো বলে সকলেই ধারণা করছে। সকল মহলই অপেক্ষায় ছিলেন ২৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গণভবনে বিরোধী দলীয় নেত্রী যাচ্ছেন কিনা, বিরোধীদলীয় নেত্রী নাকি ২৯ তারিখের পর নতুন করে আবার সরকার প্রধানকে কোনো ফোন তাঁকে করতে হবে, নাকি দূত পাঠাতে হবে, সে ধরনের হিসাব-নিকাশ থেকে রাজনীতি সচেতন মানুষ কিছুটা হতাশ এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন। ইতিমধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, যে, সরকারকেই সংলাপের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। অপরদিকে ১৪ দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে বল বিএনপির কোর্টে। সুতরাং নতুন করে কিছু সংকট তৈরি হচ্ছে বলে সকলই ধারণা করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের বিষয়টি প্রচারিত হওয়ার পরই নাগরিক সমাজের বেশির ভাগ মানুষই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘এখন উচিত বিএনপির হরতাল প্রত্যাহার করা। পরিস্থিতির উন্নতি করতে হরতাল প্রত্যাহার জরুরি’।(আমাদের সময়)। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, এ এস এম শাহজাহান, এডভোকেট সুলতানা কামাল, শফি সামি, এম হাফিজউদ্দিন খান সকলেই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা একবাক্যে দ্রুতই সংলাপে অংশ নিতে বিএনপির যাওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীই মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর একটি টেলিফোন দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা দূর করতে অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী তাতে অংশ নিলে সমাধানের একটি উপায় বের হবেই। ইতিমধ্যে জাতিসংঘসহ বিদেশি দাতাসংস্থাগুলোও এই ফোনালাপকে স্বাগত জানিয়েছে। তারাও আশা করছে যে, উভয় দল দ্রুতই সংলাপে বসবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য করণীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে মনে রাখার বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্র, রাজনীতির বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের সহজ-সরল বিশ্বাস মতো চলে না, সে রকম কোনো ফল তাতে দেয় না। এখানে জটিলতা পদে পদে বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীই রয়েছে যারা এমন একটি উদ্যোগ সফল হোক তা মনে-প্রাণে চায় না। নিজস্ব কিছু এজেন্ডা রয়েছে যার কিছু কিছু সংবাদ আমরা গত কয়েকদিনের পত্র-পত্রিকায় এবং ইলেট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি। এসব অপশক্তির অবস্থান ও ভূমিকা অনেকেই কমবেশি অবহিত। তবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দেশের বড় দুই দল, এই দুই দলের শীর্ষ দুই নেত্রী হচ্ছেন শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া। এ মুহূর্তে তাদের কে কী ভূমিকা নিচ্ছেন, কে কিভাবে রাজনীতিতে অবদান রাখেন তা একটি মস্ত বড় বিষয়। তাদের একজনের ওপর নয়, দু’জনের ভূমিকার ওপরই দেশের অনেক কিছু নির্ভর করছে। মনে রাখতে হবে তারা উভয়েই আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে গত তিন দশকের কিছু বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের দুই নেত্রীর রাজনৈতিক দল এবং আদর্শও সম্পূর্ণ আলাদা, তাদের উভয়ের মেধা, প্রজ্ঞা, যোগ্যতাও আলাদা আলাদা, তাদের উভয়ের অবদানেও রয়েছে যথেষ্ট তারতম্য। তারপরও প্রায় একই সময়ে তারা দু’জনে দেশের রাজনীতিতে এসেছেন, জয় করেছেন, অনেক কিছু দিয়েছেনও, এখন তাদের রাজনৈতিক জীবনের পরিপক্বতার প্রায় শেষপ্রান্তে, বাংলাদেশের রাজনীতিকে এই মুহূর্তে তাদের কিছু দেয়ার রয়েছে, সেটি দেয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টির অপেক্ষায় আছে। সেটি করা সম্ভব হলে দেশ ও জাতি বর্তমান ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে সক্ষম হবে—আমনটি দেখার অপেক্ষায় আছি। এর জন্যে একটি গ্রহণযোগ্য, বস্তুনিষ্ঠ ব্যবস্থা উপহার দেয়া সম্ভব হবে। তারা উভয়ই একসময়ে গণতন্ত্রের জন্যে আন্দোলন করেছেন। জয়ীও হয়ে তারা, সরকার গঠন করেছেন। কিন্তু তাদের দু’দশকের শাসন আমলেও গণতান্ত্রিক বিকাশ বাধামুক্ত হতে পারেনি। কেন হতে পারেনি তা অনেকভাবেই বিশ্লেষণযোগ্য বিষয়। সেসব সীমাবদ্ধতা, সমস্যা ও সংকট অতিক্রম করতে প্রতি পাঁচ বছর পরপরই বাংলাদেশকে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটে পড়তে হয়েছে। এই বাধাটি মোটেও দূর হওয়ার অযোগ্য নয়। বাংলাদেশে প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, যেসব অভাব-অভিযোগের কথা একে অপরের বিরুদ্ধে উত্থাপন করেন তা এখন তারা উভয়েই বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে একটি স্থায়ী সমাধানের পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবেন। কোনো এডহক সমাধান বাংলাদেশের জন্যে আর কাম্য হতে পারে না। দুই নেত্রী তাদের বয়স ও অভিজ্ঞতার এমন পর্যায়ে এসেছেন যখন তারা জাতিকে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা, দূরদর্শিতা এবং পথরেখা দিয়ে যেতে পারে যা তাদেরকে জাতির ইতিহাসে অনেক বেশি স্মরণীয় করে রাখতে পারে। তাদের একজন যদি তা বুঝতে বা উপলব্ধি করতে ভুল করেন তা হলে অন্যজনের পক্ষে এককভাবে একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমস্যা মধ্যপথে হাঁটু গেড়ে পড়ে থাকতে পারে, সেটি এরি মধ্যে দেখা গেছে। দেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে সংকট রয়েছে তা স্থায়ীভাবে দূর করতে দু’নেত্রী আজ, কাল, পরশু অথবা নিকটবর্তী যে কোনো দিন বসা জরুরি। আলোচনা করা এবং একটি স্থায়ী ব্যবস্থা দেশ ও জাতিকে উপহার দেয়া অপরিহার্য। তা দিতে তারা ব্যর্থ হওয়ার কথা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে চাই না। লেখক :অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক