স্বস্তির সুবাতাসের আভাস

দেশে শেষ পর্যন্ত স্বস্তির একটা সুবাতাসের আভাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা বরফ অনেকটাই বোধহয় গলতে শুরু করেছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৭ মিনিটের ফোনকল সেই বরফ গলার পথকে প্রসারিত করেছে। তাই মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। সেই স্বস্তির বাতাস আরো স্বস্তিদায়ক হতো যদি বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইতোমধ্যেই তাঁর হরতাল প্রত্যাহার করে নিতেন। কারণ হরতাল ও সমঝোতা তো একসঙ্গে চলে না। সমঝোতা ও নৈরাজ্য শব্দ দুটি বিপরীতার্থক। জামায়াতের চাপে হরতাল চালিয়ে যাওয়া হিতের বিপরীত বৈকি। ২৫ অক্টোবরের পর থেকে দেশে কি হবে কি হবে বলে শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে এতদিন যে উত্কণ্ঠা, সংশয় ও হতাশা বিরাজ করছিল, প্রধানমন্ত্রীর ফোনকলের মাধ্যমে তাঁর অবসানের একটা সুযোগ সৃষ্টি হল। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে নির্বাচনকালীন একটা স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা গঠন করা যায়, এবং সেই নির্বাচনী ব্যবস্থা কি কেয়ারটেকার হবে, নাকি নির্দলীয় কিংবা সর্বদলীয় হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রকে সরকারি প্রভাবমুক্ত করে- তা নেত্রীদ্বয় এক বৈঠকে আলোচনা বা সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত করে ফেলবেন, জাতিকে চাপমুক্ত করবেন এমনটায় প্রত্যাশা করছেন এ মুহূর্তে দেশের প্রায় আপামর জনগণ। আলোচনা বা সমঝোতার জন্য পূর্বশর্ত জুড়ে দেয়া, অতীতকে টেনে এনে অযথা বৈরিতা আরো বৃদ্ধি করা, হরতাল বা নৈরাজ্য চালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কেবল সমঝোতার পথকেই যে রুদ্ধ করবে তা নয়, মানুষের দুর্দশাকে আরো বাড়িয়ে দিবে, হতাহত আরো বাড়বে, দেশের অর্থনীতি নিম্নমুখী হতে থাকবে, পোশাকশিল্প হুমকির সম্মুখীন হবে, আন্তর্জাতিকভাবেও আমাদের ভঙ্গুর গণতন্ত্র নিয়ে অনেক কথা বাড়বে। তাছাড়া নির্বাচন-পূর্ব অতীতের ইতিহাস তো কারো অজানা নয়। তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগের চারটি সাধারণ নির্বাচনই অত্যন্ত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সেই নির্বাচনগুলো বেশ প্রশংসিতও হয়েছিল। তাই এই নির্বাচনী পদ্ধতিগুলো নিয়েও কারো মনে কোনো প্রশ্ন ছিল না। প্রশ্ন দেখা দিল, যখন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি অতীতে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার একটা অভিলাষ মানুষ অবলোকন করেছিল। কারা তা করেছিল তাও আর অজানা নয়। কখনো নির্বাচনী ফলাফলকে নিজেদের অনুকূলে নেবার জন্য দলীয় ও পছন্দের ব্যক্তিগুলোকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে বসানোর মাধ্যমে, আবার কখনো মাইনাস টু ফর্মুলার অংশ হিসাবে এর আয়ুষ্কাল দু’বছর পর্যন্ত ইচ্ছামতো বাড়ানো হয়েছিল। যার পরিণতিতে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি সংবিধানে আর ঠাঁই পায়নি, বাতিল হয়েছে। আর যেহেতু বাতিল হয়েছে, তাই মানুষের মনে উত্কণ্ঠা ও অস্থিরতাও বেড়েছে। কীভাবে তাহলে সামনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? তদুপরি রাজনীতিকরা কেউ কারো উপরে বিশ্বাসও রাখতে পারেন না। পরিণতিতে জ্বালা বেড়েছে জনগণের। জনগণ যেমন আর হানাহানি দেখতে চায় না, তেমনি চায় না আর মাঝে মাঝে হঠাত্ করে আবির্ভূত হওয়া তৃতীয় শক্তিকেও। মানুষ চায় শান্তি, পরিশোধিত রাজনীতি, গণতান্ত্রিক ও অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সুযোগ্য নেতৃত্ব। তাই দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সন্মানিত রাজনীতিকরা বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি স্থায়ী নির্বাচনী সমাধান খুঁজে পাবেন, যা অনেকের মতো এই অধমেরও প্রত্যাশা। আর সেজন্য আলোচনা বা সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই আলোচনা যত শর্তহীন হবে, সমাধানের পথ তত প্রসারিত হবে। লেখক :যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত alamrowshon@gmail.com