দুই নেত্রীর ফোনালাপ
সম্প্র্রচার সংবিধান পরিপন্থি
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০২
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রীর ফোনালাপ প্রচার ও প্রকাশ করায় আইন লংঘন করার অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সংবিধানের আওতাবর্হিভূত কর্মকাণ্ডকে শুধু দৈনিক ইত্তেফাক আইনের লংঘন হিসেবে চিহ্নিত করে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এ সমপ্রচারে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে, তাদেরকে জনসমক্ষে হেয় করা হয়েছে।
মানবিক মর্যাদার চেয়ে মূল্যবোধের ক্ষেত্রে আর বড় কিছু নেই। জীবনের মর্যাদা হচ্ছে সার্বিক ও নিরংকুশ মানদণ্ড। ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপাল্স অব দ্যা মেটাফিজিক্স অব মরাল্স এ উল্লেখ রয়েছে-“সৃষ্টির রাজত্বে সব কিছুর হয় মূল্য আছে, নয়ত আছে মর্যাদা।” যারই কোন মূল্য আছে, তাকে অন্য কোন কিছু বা সমমূল্যের দ্বারা বদল করা যায়। অপরদিকে যা কিছু সমস্ত মূল্যের ঊর্ধ্বে এবং সমতুল্য কিছু নেই তাই হচ্ছে মর্যাদা। জীবনের মর্যাদা কোন কিছুরই প্রতিকল্প হয় না। মর্যাদাই হচ্ছে পরম-আপেক্ষিক নয়। এমন কিছু নেই যা মর্যাদা বা সম্মানের বিনিময়ে দেয়া যায়। মর্যাদার হানি ঘটলে তাকে ফেরানো যায়না বা পুনরুদ্ধার অসাধ্য। জীবনকে যথার্থ এবং মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন-এর জন্যই স্বাধীনতা।
তাই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভিত্তি ছিলো সাম্য-মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীনতা। এটাই ছিলো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের চেতনা ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। এ ঘোষণা মুক্তিযোদ্ধা জনগণের আকাঙ্ক্ষা-যা পরিবর্তনযোগ্য নয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই হলো সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি (Genesis of the constitution)।
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন-মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে। প্রস্তাবনা সংবিধানের শীর্ষে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ-প্রস্তাবনা একটি ঘোষণা। প্রস্তাবনা সংবিধানের নিছক-শোভা কিংবা কথার বাহবা নয়।
প্রধানমন্ত্রী-বিরোধীদলীয় নেত্রী রাষ্ট্রের নাগরিক। নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে তা থেকে তাদেরকে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না। সরকারের কোন কোন মন্ত্রী ফোনালাপকে রাষ্ট্রীয় সংলাপ বলেছেন এবং রাষ্ট্রীয় এ সংলাপ জানার অধিকার জনগণের রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন। কিন্তু এ সংলাপও নয় রাষ্ট্রীয়ও নয় শুধু ফোনালাপ এবং দুজন ব্যক্তি কোন ক্রমেই রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে নয়। বরং রাষ্ট্রীয় পদবীধারীদের পদের শপথের সাথে রাষ্ট্রীয় গোপনতার শপথ নিতে হয়। ফোনালাপকে রাষ্ট্রীয় বলে তাদের নাগরিক অধিকার বা মর্যাদা হরণ করা যাবে না। আমাদের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রজাতন্ত্র হবে একটা গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যর প্রতি শ্রদ্ধবোধ নিশ্চিত হইবে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম অঙ্গীকার হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। আইনের শাসনের মূল কথা হলো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি বিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দ্বারা নয় বরং সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক আইনের দ্বারাই রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হবে। আইনের চোখে নির্বিশেষে সকল নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে। অর্থাত্ প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার ও মানবসত্তার মর্যাদা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা করেছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(১) এ বলা হয়েছে “সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন” এবং অনুচ্ছে ২৭ এ বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী” সুতরাং আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত যে সমস্ত মৌলিক বা নাগরিক অধিকার আছে তা দেশের জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ গোষ্ঠীগোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়ার নাগরিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার কোন এখতিয়ার কারো নেই। ফোনালাপ প্রকাশে সম্মানিত দু’জন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। যা নৈতিকভাবে এবং আইনগতভাবে অপরাধ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩(খ) বলা হয়েছে “চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনতা রক্ষার অধিকার থাকিবে।” এছাড়া সংবিধানের ৭ক(১)খ “এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা যড়যন্ত্র করলে তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে।” এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৬৩ এবং ৬১ অমান্য করে তা প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং দুজন বিশিষ্ট নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লংঘন এবং মানবিক মর্যাদাকে বিপর্যস্থ করায় সরকারকে অবশ্যই তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে এবং যথাযথ আইনী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নতুবা নাগরিকদের মানবিক মর্যাদা মৌলিক মানবাধিকার বিনষ্ট করার লাগামহীন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। সংবিধান রক্ষা করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশ। ক্ষতির হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে সরকার বাধ্য। রাষ্ট্র মানুষের মর্যাদা অর্জনের জন্য প্রণোদিত করবে-নৈতিক ক্ষেত্রকে ব্যাপক ও বিস্তৃত করার সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ক্ষমতার মোহ আমাদের নৈতিক অন্তর্দৃষ্টি যেন অন্ধ করে না দেয়। জনগণের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হয়েছে তা রাষ্ট্রকেই বার বার প্রমাণ করতে হয়।
লেখক : গীতিকার