আলোকপাত
কিশোর রাজনীতি ও
কিশোর অপরাধ
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০২
বাউল শিল্পী শাহ্ আব্দুল করিমের সেই জনপ্রিয় গানের কথাগুলোই সত্য— “...আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...”। সমাজের ক্রমাগত নেতিবাচক পরিবর্তন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এই বাউল শিল্পীর নজর এড়ায়নি। সুর ও ছন্দের মধ্যদিয়ে আমাদের বিবেককে প্রতিনিয়ত খোঁচা দিচ্ছে। বিশ্বায়নের আশীর্বাদ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে আধুনিক বিশ্বে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমরা অতীত ভুলে ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবো এটাই স্বাভাবিক কিন্তু বাস্তবতা এর বিপরীত। এজন্য আধুনিক জীবন-মানের উপকরণগুলো দায়ী নয়, দায়ী আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। বর্তমান প্রজন্ম তুলনামূলক ইতিবাচক কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে না বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার ঐতিহ্যগুলো ধ্বংস করছে। এখন আর দেখা যায় না জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ তরুণদের স্বেচ্ছাশ্রমের দ্বারা এলাকার উন্নয়নে কর্মসূচি গ্রহণ করতে কিংবা নিরক্ষরদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণের স্বেচ্ছায় সাক্ষরতার আলো দান। তবে ইদানীং তরুণদের মধ্যে যে বিষয়ে সংগঠিত হতে দেখা যায় তা হলো রাজনীতি। তরুণ সমাজের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন না কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত। বিষয়টি রাজনীতিবিদদের জন্য ইতিবাচক হলেও সমাজ জীবনে এর প্রভাব নেতিবাচক। বর্তমান কিশোরশ্রেণি রাজনীতির নামে যে অপ-রাজনীতি করছে তাতে সামাজিক অবক্ষয়সহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে কি না তা ভাবনার বিষয়।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপ করে জানা যায় বিশেষ করে নিম্ন-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছর তারা অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গ সংগঠনের সক্রিয় কিশোরকর্মী। বিভিন্ন মিছিল-মিটিং-এ এদের সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। অথচ স্কুল-কলেজে এদের উপস্থিতি কদাচিত্ চোখে পড়ে। কোমলমতি এসব শিক্ষার্থী ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারে না, ক্ষমতা ও পদের মোহ এদের পরম আরাধ্য। পড়া-লেখা ও ভবিষ্যত্ বিসর্জন দিয়ে এসব কিশোর স্থানীয় স্বার্থান্বেষী নেতার ক্রীড়নকে পরিণত হচ্ছে। শিক্ষাজীবন,আদর্শ, নৈতিকতা ও সততা বিসর্জন দিয়ে এসব তরুণ ভুল নির্দেশনায় ও ক্ষমতার দাপটে খুব সহজেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদর্শ, পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে এসব কিশোর মাদকাশক্তসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কিশোর অপরাধ।
আজকাল কিশোর তরুণদের মধ্যে ধারণা পড়া-লেখায় মনোযোগী থেকে খুব একটা লাভ নেই কারণ শুধু সার্টিফিকেট ও মেধা দিয়ে চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। সবক্ষেত্রেই প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয় যা দিয়ে সহজে সকল বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব। এ ধারণা যে একেবারেই অমূলক তা নয়, মাঝে মধ্যে এর প্রয়োগ দেখা যায়। এসব কারণেও অনেক শিক্ষার্থী পূর্ব থেকেই তার ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করার জন্য রাজনীতির অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠে। নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য ও নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মাঝে-মধ্যে অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। এভাবেই ক্রমশ রাজনীতি মেধাহীনদের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। বাড়ছে দুর্বৃত্তায়ন, গুরুত্ব পাচ্ছে মেধার পরিবর্তে পেশীশক্তির মূল্যায়ন। সুতরাং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের স্বার্থে সকলের উচিত অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করে বরং পড়া-লেখায় মনোযোগী করা। অন্যথায় আমাদের একটি মেধাহীন জাতির দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।
লেখক :অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ, বাড্ডা, ঢাকা
e-mail: niru_nc@yahoo.com