ক্রিকেট যখন আঁধার ঘরের আলো
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১২
রাজনৈতিক ডামাডোলের ঝড়ো হওয়ায় যখন তড়পাইতেছে আশার প্রদীপ শিখা, যখন বিমর্ষ-উত্কণ্ঠিত হইতেছে দেশের আপামর মানুষ, তখন ক্রিকেটের দামাল ছেলেরা আমাদের মুখে হাসি ফুটাইতেছে বটে। এই হাসি হয়তো নূতন জ্বালানি দিবে না ডামাডোলের আশার প্রদীপে; তাহার পরও জাতীয় গৌরব যখন আন্তর্জাতিকভাবে সমুজ্জ্বল হয়, তখন সকলের চিত্তে এই বোধ জাগাইয়া তুলিতে পারে বটে—আমরাও পারি। সেই কারণেই সকল ক্ষেত্রে আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হইতে হইবে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিগত ছয়খানি ওডিআই ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন সাফল্যে আত্মশ্লাঘার অনেক কারণ রহিয়াছে। শেষ দুইখানি ম্যাচে (বর্তমান সিরিজে) জয়ের পর এইবার পুনরায় সুযোগ আসিয়াছে তাহাদের হোয়াইটওয়াশ করিবার। আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে এই হোয়াইটওয়াশ আমরা অসংখ্যবার হইয়াছি, আমাদের প্রতীক ব্যাঘ্র হইলেও বিড়ালের ন্যায় লেজ গুটাইয়াছি বার বার। তাহা লজ্জার নহে। কেননা, হাঁটা শিখিবারকালে বারংবার আছাড় না খাওয়াটাই অস্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যেই ক্রিকেট রণাঙ্গনে ক্রমশ প্রভাবশালীদের বলয়ে উঁকিঝুঁকি মারিতে পারিতেছি, তাহা আমাদের গৌরব, আমাদের নৈপুণ্যের অর্জন। তিন বত্সর পূর্বে এই অক্টোবরেই আমরা নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ ব্যবধানে ধবল-ধোলাই করিয়াছিলাম। এইবারও পারিব নিশ্চয়ই। কিংবা যদি কোনোভাবে ফসকাইয়াও যায় দ্বিতীয় দফা বাংলাওয়াশ, বাংলাদেশ এই সিরিজের প্রথম দুইখানি ওডিআই ম্যাচ যেই দাপটের সহিত নিউজিল্যান্ডকে হারাইয়াছে, তাহা বুঝাইয়া দিয়াছে এই রাজসিক খেলার সাধারণ প্রজা আর আমরা থাকিব না।
ক্রিকেটের প্রবল জনপ্রিয়তার আঁতুড়ঘর হইতে আমরা এখন পাইতেছি অসাধারণ তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব-সোহাগের মতো অসংখ্য ম্যাচ জয়ী ক্রিকেটার। সর্বশেষ ম্যাচে ২৪৭ রান খুব বড় টার্গেট ছিল না। টিম হিসাবেও নিউজিল্যান্ড প্রথম সারির, তাহার ওপর টি-টোয়েন্টির চর্চায় ৩০০ রানও আজকাল মামুলি স্কোর হইয়া গিয়াছে। সুতরাং আশঙ্কা থাকিয়াই গিয়াছিল গত বৃহস্পতিবারই সিরিজ জয় নিশ্চিত হইবে কিনা। নিরন্তর এই জয়ের পর নিউজিল্যান্ডের নিকট বাংলাদেশ সত্যিকারের ব্যাঘ্র হইয়া উঠিয়াছে যেন। কেননা, তিন বত্সর পূর্বে ওয়ানডেতে হোয়াইটওয়াশ হওয়া দলটিই এইবার টেস্ট সিরিজে ড্র করিয়াছে।
আমরা স্মরণ করিতে চাই সেই দিনটিকে যেইদিন আমরা প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলিবার যোগ্যতা অর্জন করিলাম, ১৯৯৯-এর বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারাইলাম, অতঃপর মর্যাদা পাইলাম টেস্ট ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের। মাত্র দেড় দশক পূর্বে, ১৯৯৭ সালে যদি আইসিসি ট্রফিতে নাইরোবিতে ফাইনালে কেনিয়াকে পরাজিত করিতে না পারিতাম, আজ হয়তো এই জয়গাথা লিখিবার ক্ষেত্রই তৈরি হইত না। অথচ মাত্র ১৬ বত্সরে আমরা ৭৯টি ওয়ানডে ম্যাচ জিতিয়াছি, সিরিজ জিতিয়াছি ১৭টি। সুতরাং প্রতিটি জয়ই আমাদের নূতন শৃঙ্গ নির্মাণের সোপান তৈরি করিয়া দেয়, প্রতিটি সিরিজ জয় আমাদের উজ্জীবিত করে, আর বাংলাওয়াশ আমাদের উন্নীত করে সেই শ্রেণীতে যেইখানে শিকারীদের দ্বারা অতীতে আমরাই শিকার হইয়াছি বার বার। সুতরাং সকল কিছু মিলিয়া অদ্ভুত এক আঁধারের সময়ে এই ক্রিকেটীয় আলোকবর্তিকা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে বটে। আমাদের যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল জাতির পরিচয় দিতে হইবে সেই দায়িত্ববোধও তৈরি করিয়া দেয় এই জয়। জয়তু ক্রিকেট।