স্মরণ
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত :অহিংসা ও পরার্থপরতার
রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১২
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আমাদের কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি—এ কথা অনেকেই বলেছেন। তাঁর চেয়ে বড়ো কথা হলো, তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন বড়ো মাপের মানুষ। তাঁর বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনীটিও পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইলের এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। সেই সূত্রে বেড়েও উঠেছেন রামরাইল, কসবা ও নবীনগরের সেই সহজ সরল গ্রামীণ পরিবেশে। কলেজ জীবনের বৃহদংশ কাটিয়েছেন কলকাতায়। স্নাতক পাস করে এখানেই আইন বিষয়ে লেখাপড়া করেছেন। তারপর ফিরে এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তবে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন পরাধীন ভারতকে মুক্ত করার ইস্পাতকঠিন এক সংকল্প। শিরোধার্য করেছেন মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি ও সাদামাটা জীবনাদর্শকে। তবে অতি অল্পসময়ের জন্যে প্রথমে শিক্ষকতা এবং পরে স্থায়ীভাবে আইন পেশা গ্রহণ করলেও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেন দেশ ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামে। কংগ্রেসের তৃণমূল পর্যায়ের একজন কর্মী হিসেবে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার করেন স্বাধীনতাঁর মন্ত্র। সেই শুরু।
অতি সাধারণ এই মানুষটিই ক্রমে ঠাঁই করে নিয়েছেন সর্বভারতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে। কুমিল্লা পৌরসভা থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভা পর্যন্ত যতো নির্বাচনে তিনি অংশ নিয়েছেন—নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও—একটি ছাড়া সব নির্বাচনেই তিনি জয়ী হয়েছেন। তিনি মন্ত্রী ছিলেন। পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হিসেবে শাসনতন্ত্র প্রণয়নসহ পালন করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অভিজ্ঞ ও দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে সমাজের তলা থেকে চূড়ায় উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু এই যে উত্তরণ সেখানে কোনো উল্লম্ফন নেই। নেই কোনো প্রকার শঠতা, চাতুর্য কিংবা চাটুকারিতার পৃষ্ঠপোষকতা। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপে পা রেখে তাকে উঠে আসতে হয়েছে। উত্তীর্ণ হতে হয়েছে একের পর এক অগ্নিপরীক্ষায়। স্বীকার করতে হয়েছে অপরিসীম ত্যাগ। শুধু ব্রিটিশ শাসনামলেই তাকে ৫ বার কারাবরণ করতে হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, যে স্বাধীনতার জন্যে তিনি এতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই স্বাধীন পাকিস্তানেও বিনাবিচারে জেল খাটতে হয়েছে তাকে। ভোগ করতে হয়েছে পদে পদে লাঞ্ছনা আর অপমানের দুর্বহ যন্ত্রণা।
মাতৃভাষা, মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি প্রবল ভালবাসা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের চরিত্রের একটি উজ্জ্বলতম দিক। এর জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এ-নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ বা অনুশোচনা ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়ে তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ব্যবস্থাপক পরিষদের ডেপুটি লিডার। ছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের একজন। তখন দেশত্যাগ করে ভারতে চলে গেলে উচ্চপদে আসীন হতে পারতেন, পেতেন উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই দেশ ছেড়ে গেছেন প্রাণভয়ে। তখনও তিনি দেশত্যাগের কথা একবারও ভাবেননি। একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যাযজ্ঞের পর যখন দলে দলে লোক দেশ ছেড়ে যাচ্ছে, তখনও তিনি দেশত্যাগে সম্মত হননি একই কারণে। বরং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে সপুত্র জীবন দিয়েই মাতৃভূমি ও মাতৃভূমির মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও কর্তব্যবোধের অনবদ্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর তাত্ক্ষণিকভাবে ভারতীয় পার্লামেন্টে একটি শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল যে তিনি এমন একজন নেতা যাঁকে নিয়ে যে-কোনো জাতি গর্ব করতে পারে। কথাটি একটুও অতিরঞ্জিত নয়। ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্যে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি যে অসামান্য যুক্তি তুলে ধরেছিলেন তা আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। মূলত তাঁর এ-প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই বায়ান্নের সেই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে যায়। তবে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যদি এ-প্রস্তাব উত্থাপন নাও করতেন—তবু নির্লোভ, নিরহঙ্কার ও অসামান্য মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি আমাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকতেন।
আজ তাঁর ১২৬তম জন্মবার্ষিকী। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ৪২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অসহিষ্ণুতা ও স্বার্থপরতার রাজনীতির এই রুদ্ধশ্বাস অন্ধকারে অহিংসা ও পরার্থপরতার রাজনীতির উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা ক্রমেই বাড়ছে।
লেখক :কবি ও সাংবাদিক