‘ক্ষমতা’-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কৌশল :খেসারত দিচ্ছে জাতি

মওলানা ভাসানী বলতেন, ‘নীল নদের পানি যেমন নীল নয়, জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়’। এর সাথে যোগ করে একথাও এখন বলা যায়, ‘একতরফা নির্বাচনও নির্বাচন নয়’। কারণ, সেটি হলো কৌশল করে বিপক্ষ দলকে কৌশলে খেলা থেকে বিরত রাখার মধ্যদিয়ে ফাঁকতালে ‘ওয়াক ওভার’-এর মাধ্যমে খেলায় বিজয়ী হওয়ার প্রতারণামূলক পাঁয়তারার মতো ব্যাপার। রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যে পরিচালিত জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পিত সন্ত্রাসী তাণ্ডব এবং একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা— এ দু’টি বিষয় হয়ে উঠেছে বর্তমানে দেশ ও জনগণের জন্য সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপজ্জনক পরিণতির উত্স। জামায়াতে ইসলামী দলটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূল ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার নীলনকশা বাস্তবায়নে তত্পর রয়েছে। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের যে ভিত্তিকে নাকচ করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, সেই পরিত্যক্ত প্রতিক্রিয়াশীল ভিত্তিকে সে এদেশে আবার পুনঃস্থাপন করতে চায়। শুধু তাই নয়, সে চায় বাংলাদেশকে একটি ‘থিয়োক্র্যাটিক’ বা ধর্মীয় রাষ্ট্র বানাতে। এই লক্ষ্যে সে বহুদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্যদিয়ে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সাধিত হয়, তা জামায়াতে ইসলামীকে তাদের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের আয়োজন এগিয়ে নেয়ার অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার তখন রাষ্ট্রক্ষমতা সংহত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে তত্পর হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের সরকারের স্থলে তার নিজের সরকারের ক্ষমতা সংহত করার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে তাকে অবস্থান নিতে হয়। এয়ার মার্শাল তোয়াবের ‘উগ্র-ইসলামবাদের’ দিক থেকেও তাকে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। জামায়াতে ইসলামী এরূপ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তির বিপুল আর্থিক ও অন্যান্য সব ধরনের সহায়তায় দক্ষতার সাথে তার শক্তি বাড়াতে থাকে। জিয়াউর রহমানের নবগঠিত বিএনপির ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের ইসলাম-ঘেঁষা মতাদর্শিক ভিত্তির বাতাবরণের সুযোগও জামায়াতে ইসলামী পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগায়। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় জামায়াতে ইসলামী সযত্নে নিজের গা বাঁচিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশে স্থান করে নেয়ার কৌশল গ্রহণ করে। জামায়াতে ইসলামীর এই কৌশলী অবস্থানের বিপজ্জনক পরিণতির আশংকা সম্পর্কে সিপিবিসহ কয়েকটি বামপন্থী দলের সতর্কবাণীকে তখন আমলে নেয়নি দেশের প্রভাবশালী বুর্জোয়া দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। এই দল দু’টি জামায়াতে ইসলামীকে তাদের জোটে স্থান না দিলেও নানাভাবে তার সাথে যোগসূত্র রেখে চলার পথ নেয়। এক্ষেত্রে যে দৃষ্টিভঙ্গী ও যুক্তি তারা অনুসরণ করে তা হলো ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারকে একঘরে করে তাকে আঘাত করার জন্য সব শক্তির অবদানকে কাজে লাগাতে হবে, তার নীতি-আদর্শ যতো খারাপই হোক না কেন। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের চেয়ে আদর্শগত দ্বন্দ্বকে গৌণ বিবেচনা করে রচিত ‘আশু লক্ষ্যভিত্তিক’ নীতি-কৌশলের চিন্তা এরকম দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। এরশাদ স্বৈরাচার সকলের সাধারণ শত্রু বটে, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী এরশাদবিরোধী হলেও সে যে আরো বড় শত্রু, সেই প্রাজ্ঞ বিবেচনাকে তারা মূল্য দেয়নি। বুর্জোয়া দল দু’টির এরূপ ভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এরশাদ-উত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়। এরশাদ-উত্তর বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধান দুই প্লেয়ার হয়ে ওঠে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। জামায়াতে ইসলামী এবার এই দুই দলের বিরোধকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে তার শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়। এ পর্যায়েও বুর্জোয়া দলগুলো আদর্শগত অবস্থানের চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্নে প্রতিযোগিতাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের পথ গ্রহণ করে। জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিপদ ও শত্রু এবং তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বৃহত্তম শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার জরুরি কাজটিকে অগ্রাহ্য করে তারা পরস্পরকে প্রধান শত্রু বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে সবাইকে (জামায়াতে ইসলামীসহ) আপন বলয়ে নিয়ে আসার কৌশল অনুসরণ করে। জামায়াতে ইসলামীকে পক্ষে রাখার জন্য দু’দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। জামায়াতে ইসলামী এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা শক্তি বাড়িয়ে যেতে থাকে। এরূপ একটি সময়ে জামায়াতে ইসলামী তার অবস্থানকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে দলের আমির ঘোষণা করে। সময়টা ছিল খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামল। জামায়াতে ইসলামীর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে দেশবাসী। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে, গঠিত হয় গণআদালত। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে। এই আন্দোলনে সে শরিক হয়। বিএনপি আন্দোলনের বিরোধিতা করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুটি সামনে থাকলেও প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করতে থাকে বুর্জোয়া দল দু’টির মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। এই সত্যটি প্রকাশ হয়ে পড়ে যখন নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইস্যুতে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলতে শুরু করে। সে সময় তার ক্ষমতার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে কোণঠাসা করার জন্য আওয়ামী লীগ আদর্শগত মূল শত্রু জামায়াতে ইসলামীর সাথে ‘কৌশলগত ঐক্য’ করে। আদর্শের বিবেচনার চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের এরূপ ভ্রান্তির সুযোগে জামায়াতে ইসলামী দু’দলের কাছেই তার বাজারদর বাড়িয়ে আরো বড় সুবিধা গ্রহণের পদক্ষেপ নেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামীকে পক্ষে আনার জন্য বিএনপি উতলা হয়ে ওঠে। ৪-দলীয় জোট গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের প্রশ্রয় পাওয়া জামায়াতে ইসলামী এবার পুরোপুরি বিএনপির আশ্রয়প্রাপ্ত হয়। ক্ষমতার খেলায় বিএনপির বিজয়ের ফসলের ভাগীদার হয়ে জামায়াতে ইসলামী মন্ত্রিসভাতে স্থান করে নেয়। সে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রে ব্যাপক অনুপ্রবেশের সুযোগ পেয়ে যায়। দেশে নতুন নতুন সাম্প্রদায়িক জঙ্গি প্লাটফর্ম সে গড়ে তুলতে থাকে। তালেবান ও আল-কায়েদা কানেকশনের শক্তিকেও সে সমন্বিত করার কাজ চালাতে থাকে। এভাবে সে তার শক্তিকে এক বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুব সমাজের ব্যাপক সমর্থন পায়। এই প্রতিশ্রুতি দিতে এবার আওয়ামী লীগ দ্বিধান্বিত ছিল না। কারণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এবার জামায়াতে ইসলামী ৪-দলের মাধ্যমে বিএনপির সাথে গাঁটছড়া বাঁধা ছিল। ক্ষমতার ইস্যু ও আদর্শিক ইস্যু এক্ষেত্রে এক জায়গায় চলে আসায় এটি ঘটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ইতোমধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামী এখন আরো বড় ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী অভিযান চালানোর সক্ষমতা সঞ্চয় করে নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া, একের পর এক রায় হতে থাকা— ইত্যাদি আঘাত মোকাবেলার জন্য সে এখন পাল্টা অভিযান চালানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। হেফাজতের প্লাটফর্ম তৈরি করে সেটিকেও সে কাজে লাগাচ্ছে। ক্ষমতার অংক মিলানোর জন্য বিএনপি তাকে আশ্রয় দিয়ে চলেছে। ১৮-দলীয় জোট গঠন করে গদি দখলের খেলায় জয়লাভের জন্য তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এরূপ প্রেক্ষাপটেই দেশের সামনে এখন আবির্ভূত হয়েছে দ্বিতীয় বিপজ্জনক আশঙ্কাটি। সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে গুরুতর অনিশ্চয়তা। ২৪ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। অন্যথায় দেশ গভীর সাংবিধানিক সংকটে নিপতিত হবে। কিন্তু কোন্ ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে মতবিরোধ এক বিপজ্জনক অচলাবস্থার জন্ম দিয়েছে। ’৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে এ নিয়ে বিতর্কের মীমাংসা হয়েছিল। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের অভিজ্ঞতা ও আরো কিছু ঘটনা এই বিতর্ককে আবারও ফিরিয়ে এনেছে। ত্রয়োদশ সংশোধনী সম্পর্কে উচ্চ আদালতের রায়ের পরামর্শ (পার্লামেন্ট ইচ্ছে করলে আগামী ২ মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখতে পারবে) অগ্রাহ্য করে একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করায় ‘অচলাবস্থা ও সংকট’ সৃষ্টিতে আগ্রহী মহল সুযোগ পেয়েছে। এক্ষেত্রে বিতর্ক এখন কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে নির্বাচনকালে কি ধরনের সরকার থাকবে, তা নিয়ে। সরকারের প্রস্তাব হলো, সংবিধান সম্মতভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ সরকার। বিএনপির দাবি হলো ‘নির্দলীয়’ সরকার। কিছুটা কাছাকাছি এসেও অলঙ্ঘনীয় দ্বিমত সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার-প্রধান কে হবে, তা নিয়ে। কারণ, প্রচলিত আইনে সরকার-প্রধানই হচ্ছে সর্বেসর্বা। দু’পক্ষই নিজ-নিজ স্থানে অনড়। এ বিষয়ে সমঝোতা না হলে সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হবে না— এরূপ বিপজ্জনক আশঙ্কা সৃষ্টি হয়ে আছে। ‘একতরফা নির্বাচন’ বিপজ্জনক কারণ তা সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে এমন অরাজক অবস্থার জন্ম দিতে পারে যাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই বিনষ্ট হতে পারে। এর পরিণতিতে ওয়ান-ইলেভেন বা তার চেয়ে বিপজ্জনক পরিণতির জন্ম হতে পারে। বিভিন্ন দলে ও মহলে এখন এই সমগ্র বিষয় নিয়ে পাল্টাপাল্টি দু’ধরনের উদ্যোগ চলছে। একটি উদ্যোগ হলো নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার মাধ্যমে সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা। বিপরীতমুখী অপর উদ্যোগটি হলো, যে কোনো উপায়ে সেরূপ সমঝোতার পথ রোধ করা, যাতে হয় একতরফা নির্বাচন কিংবা অচলাবস্থা ও নৈরাজ্যের সুযোগে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষুণ্ন করা যায়। এই বিরোধকে কেবল দুটি বুর্জোয়া দলের বিরোধ বলে হালকাভাবে নেয়া ঠিক হবে না। বুর্জোয়া দু’টি দল এরূপ অচলাবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী হলেও এই বিরোধের ফলে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাতে বুর্জোয়ারা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের শ্রমজীবী মানুষ। তাদের রুটি-রুজির আন্দোলনের ওপর আসবে হামলা। বিরোধ মীমাংসার জন্য কোন উদ্যোগকে বুর্জোয়াদের ঝগড়া মিটানোর জন্য দেন-দরবার বলে মনে হলেও তা বর্তমান মুহূর্তে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে একটি জরুরি কর্তব্য। শ্রমজীবীসহ সাধারণ মানুষের প্রবল চাপই কেবল গণতন্ত্র হরণের ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করতে পারে। সে কারণে বিরোধ মীমাংসার জন্য চেষ্টার পাশাপাশি এ বিষয়ে স্বাধীন উদ্যোগে ব্যাপক জনমত গড়ার কাজেও গুরুত্ব দিতে হবে। একতরফা নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীকে ও তার পৃষ্ঠপোষক বিএনপিকে পরাভূত করার একটি সহজ কৌশল হতে পারে— এরকম চিন্তা থেকে কেউ কেউ ‘সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের’ লক্ষ্যটিকে অনুপযুক্ত মনে করছেন। কিন্তু ‘একতরফা নির্বাচনের’ ফলাফল কি অতীতে স্থায়ী করা গেছে? এর ফলে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির পক্ষে কি পরবর্তীতে আরো শক্তিশালী জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার আশংকা তৈরি হবে না? দেশে সংঘাত-নৈরাজ্য ইত্যাদি আরো বৃদ্ধি পেয়ে তা কি সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক শাসনে ছেদ ঘটিয়ে জনগণকে অধিকারহীন করার বিপদকে আরো বাড়িয়ে দিবে না? অসত্ পন্থায় কখনো কি কোনো সত্ উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সফল করা যায়? সাম্প্রদায়িক বিপদ মোকাবেলার জন্য গণতন্ত্রের স্বচ্ছ পথকে কেন বিসর্জন দিতে হবে? বিষয়টি অনেকটা মুক্তিযুদ্ধচলাকালে খুনী মোশতাকের ‘জীবিত মুজিবকে চাও, না স্বাধীন দেশ চাও’ বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর মতো ব্যাপার! জীবিত মুজিবকে চাইলে স্বাধীনতার প্রশ্নে ছাড় দিতে হবে কেন? এখনো সাম্প্রদায়িকতার বিপদ মোকাবেলা করতে হলে গণতন্ত্রের স্বচ্ছ পথ (এক্ষেত্রে সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠান) পরিত্যাগ করতে হবে কেন? ‘মতাদর্শ-কেন্দ্রিক’ বিবেচনাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিছক ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক’ বিবেচনা থেকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের ভ্রান্তির খেসারত দিতে হচ্ছে জাতিকে। বর্তমান বিপদকে মোকাবেলার জন্য সবরকম চেষ্টা করতে হবে। তা সত্ত্বেও আরো বড় বিপদ নেমে আসতে পারে। সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। শত্রুর আঘাত মোকাবেলা করে শক্ত পায়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে শুরু করতে হবে নতুন করে চেপে বসা ‘পাকিস্তানের ভূতের’ বিরুদ্ধে অথবা ‘স্বৈরশাসনের’ বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ যুদ্ধ। সে পর্বে কৌশল গ্রহণের ক্ষেত্রে যেন অতীতের ভ্রান্তি আর না থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে ‘আদর্শিক’ বিবেচনাকে ‘ক্ষমতার’ বিবেচনার চেয়ে গৌণ করে দেখার মতো ক্ষমা-অযোগ্য ভুল আর করতে দেয়া যাবে না। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি E-mail : selimcpb@yahoo.com