নির্বাচনী জনমত জরিপ প্রসঙ্গে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের অভিমত
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৮
বিভিন্ন মহলের পরিচালিত নির্বাচনকালীন জনমত জরিপকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়া এই প্রসঙ্গে তাত্পর্যপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করিয়াছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন। তাহাদের মতে, এইসব জরিপের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এইগুলি তৈরি ও প্রকাশ করা হয়। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যে কোনো জনমত জরিপকে ইচ্ছামতো প্রভাবিত করা যায়। ফলে এই ধরনের জনমত জরিপ জনগণের উপকারের চাইতে ক্ষতিই বেশি করে বলিয়া মন্তব্য করিয়াছে উক্ত কমিশন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জনমত জরিপের ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের মতামত জানিতে চাহিয়া চিঠি দিয়াছিল দেশটির নির্বাচন কমিশন। এই ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী মতামত ব্যক্ত করিয়াছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনী জরিপ নিষিদ্ধ করিবার দাবি তুলিয়াছে কংগ্রেস। কারণ তাহারাও মনে করে যে, জরিপ হইতে কোনো একটি পক্ষ যেমন উপকৃত হইতে পারে, তেমনি অপর পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে। তাহাদের মতে, জরিপ চূড়ান্ত কিছু নহে। কিন্তু জনগণ ইহার দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাহাদের মনে এই ধারণা জন্মে যে জরিপের ফলই সত্য হইবে। অথচ একেক জরিপে একেক রকম ফল পাওয়া যায়। অন্যদিকে, বিজেপির অবস্থান ইহার সম্পূর্ণ বিপরীত। জনগণের অভিমত প্রকাশের অধিকার কেহ কাড়িয়া লইতে পারে না— এই মন্তব্য করিয়া দলটির মুখপাত্র বলিয়াছেন যে কংগ্রেসের অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন জরিপে সেই তথ্য উঠিয়া আসিতেছে বলিয়াই তাহারা জনমত জরিপ নিষিদ্ধ করিবার কথা বলিতেছে। সব মিলাইয়া, বিতর্ক জমিয়া উঠিয়াছে এবং তাহা ভারতের জন্য তো বটেই, একই সাথে বাংলাদেশের মতো গণতন্ত্রের অপেক্ষাকৃত নবীন অভিযাত্রীদের জন্যও নিঃসন্দেহে খুবই প্রাসঙ্গিক।
উন্নত বিশ্বে জনমত জরিপের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করিয়া আমেরিকা ও অষ্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলিতে নির্বাচনকালীন জনমত জরিপ নিয়মিত বিষয় শুধু নহে, ইহার প্রভাবও অত্যন্ত ব্যাপক। একাধিক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এইসব জরিপ পরিচালনা করিয়া থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জরিপের ফলাফল প্রকৃত ফলাফলের এতোটাই নিকটবর্তী হয় যে তাহার গ্রহণযোগ্যতা লইয়া প্রশ্ন তোলার অবকাশই থাকে না। অতএব, সেইসব দেশে জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলির যে একটি উচ্চতর পেশাদারি মান দাঁড়াইয়া গিয়াছে তাহা সহজেই বোঝা যায়। পাশাপাশি, দলীয় প্রভাববলয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে উদ্দেশ্যমূলকভাবেও যে কিছু কিছু জরিপ পরিচালিত হয় না এমন নহে। তবে বিশ্বাসযোগ্যতার খাতিরে তাহাদের পক্ষেও পেশাদারিত্বের সীমা সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করা সম্ভব হয় না কখনোই। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এইখানে নির্বাচনে জিতিবার জন্য যে সবই করা সম্ভব— সেই অভিজ্ঞতা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলেরই আছে। ভারত বিশ্বের বৃহত্ গণতন্ত্রই শুধু নহে, কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণও বটে। তাহা সত্ত্বেও জনমত জরিপ লইয়া সেই দেশের নির্বাচন কমিশন যেই অভিমত বা আশঙ্কা ব্যক্ত করিয়াছে তাহাকে হালকা করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। আমাদের ক্ষেত্রে এই আশঙ্কা যে আরও বেশি করিয়া প্রযোজ্য— তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। নির্বাচনকালীন জনমত জরিপের অধিকার যেমন সকলেরই আছে, তেমনি ইহার নেতিবাচক দিকটিও উপেক্ষা করিবার উপায় নাই। ইহাও অনস্বীকার্য যে, জরিপের ফলাফল যাহার পক্ষে যাইবে তাহারা উত্ফুল্ল বোধ করিবেন, আর যাহাদের বিপক্ষে যাইবে তাহারা অবশ্যই ক্ষুব্ধ হইবেন। সামগ্রিক এই বাস্তবতার নিরিখে আমাদের নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহল বিষয়টিকে বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে পারেন বৈকি।