বর্ষ
হিজরি নববর্ষে নব জীবনের
উন্মেষ ঘটুক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৮
আজ পহেলা মহররম। হিজরি নববর্ষের প্রথম দিন। ইসলামী তাহযীব-তামুদ্দুন বিকাশের দিন। বিশ্বের মুসলমানদের স্বকীয় সংস্কৃতির আলোর উন্মীলনে উদ্ভাসিত উজ্জীবিত হওয়ার উজ্জ্বল দিন। বিজাতীয় সংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির খোলস থেকে বের হয়ে সুষ্ঠু সুন্দর সুনির্মল সংস্কৃতির আবহে নবজীবনের উন্মেষ ঘটানোর স্বর্ণালী দিন। আমরা মুসলমান। আমাদের রব আল্লাহ। আমাদের নবী মুহাম্মদ (স.)। আমাদের কেতাব আল কুরআনূল কারীম। আমাদের ধর্ম আল ইসলাম। ইসলাম অন্যান্য জাতি-ধর্মের মানুষের মত বর্ষবরণ ও আনন্দোত্সব পালনে লাগামহীন চলাফেরায় সমর্থন করে না। ইংরেজি নববর্ষ পালনের নামে থার্টি ফার্স্ট নাইটে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বাংলা নববর্ষ পালনের নামে পহেলা বৈশাখে তারুণ্যের উচ্ছল তরঙ্গমালা যেভাবে ঢেউ খেলে যায় তা কোনো আল্লাহপ্রেমী পরকালে বিশ্বাসী তাকওয়াবান মুসলমানের নিকট অগ্রহণীয়। মুসলমানদের প্রত্যেকটি আনন্দোত্সবের সূচনা হয় আল্লাহু আকবার ধ্বনি ও প্রভু পরওয়ারদেগারের সেজদার মাধ্যমে। বর্ষবরণ শুরু হয় তওবা তাহ্লীলের মাধ্যমে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালার নির্ধারিত সময় হতে একটি বত্সর যে আমাদের জীবন থেকে অতিবাহিত হয়ে গেল তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া ও রাব্বুল আলামীনের দরবারে ইলাহীতে পানাহ্ চাওয়ার মাধ্যমে। আল্লাহর কাছে সেজদার মাধ্যমে। যে সময় বিশ্বের মুসলমানেরা তাদের নিজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি সভ্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে সেই মুহূর্তে হিজরি নববর্ষ হাতছানি দিচ্ছে— ইসলামী সংস্কৃতি সভ্যতার আঙ্গিনায় ফিরে আসার জন্য। হিজরি নববর্ষকে স্বাগত জানাই। হূদয়ের সব উষ্ণতা দিয়ে তাকে গ্রহণ করি। কালের গর্ভে হারিয়ে গেল ১৪৩৪ হিজরি। চলে এলো ১৪৩৫ হিজরি আমরা অনেকেই হিজরি সনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবহিত নই। সেদিন ছিল ১২ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর নির্দেশে মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। তারপর তার খলিফা আমীরুল মোমেনীন হযরত ওমর (রা.) এর জামানায় যখন ইসলামী ভূখন্ডের সীমানা বিস্তার হতে থাকলো। বিভিন্ন রাজা-বাদশাদের কাছে চিঠিপত্র ইত্যাদি প্রেরণে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হলো। তখন তিনি ১৭ হিজরি অর্থাত্ রসূল (স.) এর ইন্তেকালের ৭ বছর পর হতে হিজরি সনের প্রবর্তন করেন। রসূল (স.) এর প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করা হতে এই সনের গণনা ধরা হয়। আমরা জানি— রসূল (স.) যখন ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তখন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা বিরোধিতা শুরু করলো। তার চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো। নামাজরত অবস্থায় উটের নাড়ি-ভুঁড়ি মাথায় চাপিয়ে দিতো। পথে-প্রান্তে অপমানিত লাঞ্ছিত করা হতো। তার অনুসারী নব মুসলিমদের ওপর চালানো হচ্ছিল অমানুষিক নির্যাতন। অত্যাচারের স্টিম রোলারে তাদেরকে ক্ষত-বিক্ষত করা হতো। রসূল (স.) ও তাঁর সাথীদের শি’বে আবু তালিব নামক বন্দী শিবিরে তিন বছর বন্দী করে রাখলো। তারপরও রসূল (স.) একত্ববাদের দাওয়াত হতে ফিরে না আসায় তারা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করলো। নদওয়া নামক মন্ত্রণা পরিষদে অধ্যাদেশ জারি করলো— যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (স.) এর ছিন্ন মস্তক এখানে হাজির করতে পারবে তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে। তখন আরবের বিভিন্ন গোত্র হতে নওজোয়ান পাহলোয়ান যুবকেরা নাঙ্গা-তরবারি নিয়ে রসূল (স.) এর বাড়ির চতুর্পার্শ্বে জমায়েত হলো। আল্লাহ তায়ালা জিব্রাইলকে (আ.) ঘোষণা দিয়ে পাঠালেন। তিনি এসে বলেন, হে রসূল (স.), আজ রাত হতে এই বিছানায় ঘুমানো আল্লাহ আপনার জন্য নিষিদ্ধ করেছেন। আপনাকে মদীনায় হিজরতের আদেশ করেছেন। তখন রসূল (স.) নিজ বিছানায় আলীকে (রা.) শায়িত রেখে বের হলেন। ওদিকে রসূল (স.) হিজরত করে মদীনায় আসছেন সেজন্য মদীনার মানুষেরা অধীর আগ্রহে প্রত্যেক দিন একটি উঁচু টিলার ওপর বসে অপেক্ষার প্রহর গুনতেন। একদিন তারা চলে যাওয়ার পর এক ইহুদী দূর থেকে রসূল (স.) এর কাফেলা দেখে চিনে ফেললেন। তিনি খবর দিলেন। হে কুব্বার মানুষেরা তোমরা প্রত্যেকদিন যার জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকো সেই ব্যক্তি ঐ দেখ চলে আসছেন। তখন কুব্বায় আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হলো। সবাই নবী মুহাম্মদ (স.) কে স্বাগত জানালেন। রসূল (স.) তিনদিন কুব্বায় অবস্থানের সময় একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন। নাম মসজিদে কুব্বা। আজকের এই হিজরি নববর্ষে আমরা রসূল (স.) এর এই হিজরতের ঐতিহাসিক পটভূমি হূদয়ে জাগরুক করি। আমাদের সমাজকে রসূল (স.) এর জামানার শান্তিময় সোনালী সমাজ বিনির্মাণে নিজ নিজ স্থান থেকে সাধ্যমত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।
ই-মেইল: mzhazadi@yahoo.com