স্মরণ
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর অসমাপ্ত স্মৃতিকথা
প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪২
আমার অতি প্রিয়বন্ধু মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘স্মৃতির সন্ধানে’ বইটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি এবং প্রায় সত্তর বছরের রাজনীতি ও সংস্কৃতির ইতিহাস পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। ১৯৪৭-৪৮ সহ পঞ্চাশ দশক থেকে আমি তাঁর সাথে একান্ত বন্ধুত্বের সূত্রে আবদ্ধ ছিলাম। তাঁর স্মৃতিকথায় মাতৃহারা চার বছর বয়সী শিশু মাহবুবের জীবন পথে রক্তের অমলিন বন্ধনে মামাদের সাথে বেড়ে উঠার কথা উল্লেখ আছে, যৌবনকালে তিনি ক্রমশ বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। অসামপ্রদায়িক মানবতাবাদী মাহবুব তাঁর সমগ্র জীবনের নানা স্মৃতিতে যেসব কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের তথা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিপুণ ছবি প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৪৭-৪৮ এ অতি বাম কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবে তিনি আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে শোভাযাত্রায় শ্লোগান দিয়েছিলেন— ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, ভুলো মাত্ ভুলো মাত্’। তিনি সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রথম যৌবন থেকে আন্দোলন করেছেন। মাহবুব চল্লিশ দশক থেকেই কোনো মুসলিম ছাত্র সংগঠনে যোগ দেননি। এমনকি জাতীয়তাবাদী ছাত্র কংগ্রেসে বেশিদিন থাকেননি। স্মৃতিকথায় এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে কমিউনিস্ট প্রভাবিত ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে বাম রাজনীতিতে যোগদানের কথা লিখেছেন।
১৯৫১ সালে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য চলে আসি তখন মাহবুব কলকাতা যাবার পথে ঢাকা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ঢাকা হলে আমার সঙ্গে থাকতেন। তাঁর স্মৃতিকথায় এসব প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তখনকার তরুণ সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং কমিউনিস্ট প্রভাবান্বিত ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের আমার রুমে আড্ডার কথা তিনি স্মৃতিকথায় লিখেছেন। তিনি সে সময় তরুণ উদীয়মান কবি শামসুর রাহমানের কবিতাগুচ্ছ কলকাতায় নিয়ে যান এবং সেগুলো বুদ্ধদেব বসু, আবু সয়ীদ আইয়ুব, সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ সাহিত্যিকদের দেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় শামসুর রাহমানের কবিতাগুচ্ছ প্রথম প্রকাশিত হয়। এইসব খ্যাতনামা ব্যক্তিদের প্রাথমিক যোগসূত্রের বাহন ছিলেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী।
১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শীর্ষক কবিতার জনক মাহবুব উল আলম চৌধুরীর রচিত ‘আমার স্মৃতিতে ভাষা আন্দোলন’ অধ্যায়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই স্মৃতিকথাকে আমি একটি অসামান্য ডকুমেন্ট হিসেবে দেখছি এবং এতে মানবতাবাদী কবি ও সংস্কৃতি সাধকের অপূর্ব বর্ণময় জীবনচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি তাঁর ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তাঁর পিতা ও শিক্ষকদের কথা আবেগ-ভরে উল্লেখ করেছেন। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদকে তিনি তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা, উপমহাদেশের বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কবি হুমায়ুন কবিরকে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি স্মৃতিকথায় ঐতিহ্যের কথা বলতে গিয়ে বাঙালির গৌরব তিব্বত-বিশারদ শরচ্চন্দ্র দাশ, বৌদ্ধ চর্যাপদ আবিষ্কারক কীর্তিমান হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অবদানের বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনে তিনি কৃষকদের তেভাগা লড়াই, ইলা মিত্রের আপসহীন সংগ্রাম বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন, নাচোল বিদ্রোহ ও ইলা মিত্র বিষয়ে তাঁর স্মৃতি থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উল্লেখ করেছেন। তার পরিচালনায় সংস্কৃতি বৈঠক ও প্রান্তিক নবনাট্য সংঘের কার্যক্রমে চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুখরিত হয়েছে। তাঁর অসমাপ্ত স্মৃতিকথা ইতিহাসের বিভিন্ন ক্রান্তিকাল, দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিণতি ও বিদীর্ণ বাংলার বর্ণনায় একদিকে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, অন্যদিকে তাঁর জীবনের বন্ধুদের সাথে বিচ্ছেদ ও বিরহের বর্ণনা রয়েছে।
এই স্মৃতিকথা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং বৃহত্তর পরিধিতে সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক :সাংবাদিক