ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের সুরক্ষা

ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রের তুলনায় আমরা যে পিছাইয়া আছি তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সুরক্ষা শব্দটির তাত্পর্য ব্যাপক। তবে ইহার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হইল, ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের ওপর নিজেদের আইনগত স্বীকৃতি বা অধিকার প্রতিষ্ঠা। বিষয়টি এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, শুধু আইনগত স্বীকৃতি না থাকিবার কারণে এই ধরনের অতি মূল্যবান বহু সম্পদ বেহাত হইয়া যাওয়ার উদাহরণ ভূরি ভূরি। মূলত এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই জাতিসংঘকে এইদিকে বিশেষ মনোযোগ প্রদানে বাধ্য করিয়াছিল। সেই সাথে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রেও ঠাঁই করিয়া লইয়াছিল ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের স্বীকৃতির বিষয়টি। মোট ৩০টি ধারা-সংবলিত এই ঘোষণাপত্রের ২৭(খ) নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে, ‘প্রত্যেকেরই বিজ্ঞান, সাহিত্য অথবা শিল্পকলাভিত্তিক সৃজনশীল কাজ হইতে উদভূত নৈতিক ও বৈষয়িক স্বার্থসমূহ রক্ষণের অধিকার রহিয়াছে’। ইহার পর বহু জল গড়াইয়া গিয়াছে সাগরে-মহাসাগরে। ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের অধিকার ও স্বীকৃতি লইয়া বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বৃহত্ বাণিজ্য সংস্থাগুলির মধ্যে বাকবিতণ্ডা, এমনকী আইনি লড়াইও কম হয় নাই। উদভূত বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাও গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করিয়াছে বিষয়টিকে। প্রণীত হইয়াছে স্বতন্ত্র বিধি বা আইন। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে উপযুক্ত আইনি ভিত্তি না থাকিবার কারণে এই যাবতকাল আমরা নিজেদের সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সেই লড়াইয়ে সামিল হইতে পারি নাই। এই প্রেক্ষাপটে গত মঙ্গলবার ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩’ নামে একটি বিল পাস করিয়াছে জাতীয় সংসদ। ইহার লক্ষ্য হইল ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের যথাযথ স্বীকৃতি আদায়। উদ্যোগটি প্রশংসনীয়, তবে ইহা লইয়া আত্মতুষ্টিতে ভুগিবার কোনো অবকাশ নাই। মনে রাখিতে হইবে যে, ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের সুরক্ষার কাজটি বিশাল এবং জটিল। এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য পাইতে হইলে পাড়ি দিতে হইবে দীর্ঘপথ। সদ্য পাস হওয়া আইনটি সেই দীর্ঘ পথযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। প্রথমেই যেই প্রশ্নটির মীমাংসা হওয়া দরকার তাহা হইল, আমাদের কী কী ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদ রহিয়াছে তাহা কি আমরা নিশ্চিতভাবে জানি? ইহার উত্তর ইতিবাচক হইলে খুবই ভালো। যদি না হয়, তাহা হইলে অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বচ্ছ ও বিশদভাবে সেই তালিকাটি চূড়ান্ত করিতে হইবে। ইহার পর যাচাই-বাছাই করিয়া দেখিতে হইবে যে, ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত কোনো সম্পদ আমাদের হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে কিনা। উদাহরণ হিসাবে জামদানির প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যায়। জামদানিকে আমাদের ঐতিহ্যগত সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অথচ ভারত ইতিমধ্যেই তাহা নিজেদের নামে নিবন্ধিত করিয়া ফেলিয়াছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ধরনের আরও বেশকিছু বুদ্ধিভিত্তিক ও ভৌগোলিক সম্পদ আমাদের হাতছাড়া হইয়া গিয়াছে। সেই ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অনুরূপ বিরোধাত্মক বিষয়গুলির নিষ্পত্তি করিতে হইবে জরুরিভিত্তিতে। প্রয়োজনে গ্রহণ করিতে হইবে আন্তর্জাতিক আইনের আশ্রয়। একই সাথে আর কোনো সম্পদ যাহাতে বেহাত হইতে না পারে— তাহাও নিশ্চিত করিতে হইবে। ঐতিহ্য ও মেধাসম্পদের উদাহরণ দিতে গিয়া প্রায়শ পদ্মার ইলিশ, নকশিকাঁথা, কুমিল্লার রসমালাই, নাটোরের কাঁচাগোল্লাসহ গুটিকয় পণ্যের নাম উল্লিখিত হইয়া থাকে। কিন্তু ইহা যে আমাদের সম্পদভাণ্ডারের অতি ক্ষুদ্র অংশ তাহাতে সন্দেহ নাই। যাবতীয় সম্পদ চিহ্নিতকরণ, নিবন্ধন ও সংরক্ষণে সদ্যপাস হওয়া আইনটি যে খুবই সহায়ক হইবে তাহা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে এই ধরনের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে শুধু আইনই যে যথেষ্ট নহে, সেই অভিজ্ঞতাও আমাদের অঢেল। আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হইল আসল চ্যালেঞ্জ।