সিরিয়া শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া কেন থামিয়া গেল

সরকার ও সরকার-বিরোধীদের হানাহানিতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাইয়া যাওয়া সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা শুরু করিবার প্রক্রিয়াটি থমকাইয়া গিয়াছে। গত মঙ্গলবার জেনেভাতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সিরিয়া সংক্রান্ত ত্রিপক্ষীয় সভাটি, শান্তি-আলোচনা শুরু করিবার কোন তারিখ নির্ধারণ ব্যতিরেকেই সমাপ্ত হইয়াছে। ইহার ফলে সহসা দেশটিতে রক্তপাত বন্ধ হইবার আশা তিরোহিত হইল বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। উল্লেখ্য, এই সভাটিতে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া ব্যতীত জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের অপর তিন সদস্য রাষ্ট্র অর্থাত্ চীন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এবং সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলি অর্থাত্ জর্দান, লেবানন, তুরস্ক ও ইরাকের প্রতিনিধিবৃন্দ যোগ দিয়াছিলেন। আরব লীগের প্রতিনিধিবৃন্দও সিরিয়ার ভবিষ্যত্ নির্ধারণকারী সভাটিতে উপস্থিত ছিলেন। জেনেভার সভাটি ঘিরিয়া সিরিয়া প্রসঙ্গে এক ধরনের আশাবাদ তৈরি হইয়াছিল। আশা করা হইয়াছিল যে, বিবদমান দুইপক্ষ যদি ন্যূনতম দুই-একটি বিষয়েও সমঝোতায় আসিতে পারে তাহা হইলে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে শান্তি-আলোচনা শুরু করিয়া দেওয়াটা অসম্ভব হইবে না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেই আশাবাদ ভুল প্রমাণিত হইল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, সরকারবিরোধীদের পূর্বশর্ত আরোপের কারণেই জেনেভার সভাটি হইতে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় নাই। উল্লেখ্য, ত্রিপক্ষীয় সভার পূর্বে সিরিয়া কর্তৃপক্ষ জানাইয়া দেয় যেকোন ধরনের পূর্বশর্ত ব্যতিরেকেই সরকার বিরোধীদিগের সহিত সংলাপে বসিতে প্রস্তুত হইয়া আছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ হইতে এই ধরনের কোন নমনীয়তা দেখানো হয় নাই। জেনেভার সভার কয়েক দিন পূর্বে পশ্চিমা শক্তিগুলির সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল (এসএনসি) জানায় যে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ কবে নাগাদ ক্ষমতা ছাড়িয়া দিবেন তাহা না জানিয়া তাহারা শান্তি আলোচনায় বসিতে পারিবেন না। ইরানকে শান্তি আলোচনায় ডাকিবার ব্যাপারেও আপত্তির কথা জানায় এসএনসি। এইদিকে, শান্তি আলোচনায় কাহারা সরকারবিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করিবেন তাহা লইয়াও মতদ্বৈধতা চলিতেছে। এমনকি, পশ্চিমা শক্তিগুলি তথা যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টা-চরিত্র সত্ত্বেও সরকারবিরোধী বিবদমান পক্ষগুলিকে একটি প্ল্যাটফর্মে লইয়া আসা সম্ভবপর হইতেছে না। এমনকি, চলতি মাসের ২৫ তারিখে নূতন করিয়া আলোচনা শুরু করিবার জন্য এসএনসি’র দাবিটির ব্যাপারেও ঘোর আপত্তি জানাইয়াছে ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন বডি (এনসিবি)সহ সরকারবিরোধী অপর কয়েকটি গ্রুপ। শান্তি আলোচনা শুরু হইবার বিলম্বের মধ্যে “আরও রক্তপাত এবং সিরিয়ার জনগণের ইচ্ছার সত্যিকারের পরাজয়” দেখিতে পাইতেছে এনসিবি। বিবদমান বিরোধীরা কবে নাগাদ একটি জায়গায় পৌঁছিয়া সরকারপক্ষের সহিত শান্তি-আলোচনা শুরু করিতে পারিবে তাহা এক্ষণে এতটুকু স্পষ্ট হইতেছে না। ২০১১ সালের মার্চ মাস হইতে সিরিয়ায় রাজনৈতিক দুর্যোগ চলিতেছে। সরকার ও সরকারবিরোধী পরিচয়ের আবরণে চলিতেছে শিয়া-সুন্নী সংঘাত। চলমান সংঘাতে এই যাবত্ প্রাণ হারাইয়াছে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ। আহত ও দেশত্যাগীর সংখ্যা ইয়ত্তাহীন। কোন পক্ষই দায়-দায়িত্ব স্বীকার না করিলেও, এই সংঘাতে একাধিকবার ব্যবহূত হইয়াছে রাসায়নিক অস্ত্র। নৃশংসতায় পাল্লা দিতেছে উভয় পক্ষ। আঞ্চলিক ও প্রধান বিশ্বশক্তিগুলি দুইপক্ষে ভাগ হইয়া যেন গৃহযুদ্ধ অবলোকন করিতেছে! পরিস্থিতি এমনই যে, দেশটিতে গণজাগরণের আদৌ কোন আলোকরেখাও দেখা যাইতেছে না। এমন একটি অবস্থায় সিরিয়াকে বাঁচাইতে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষদিগের জাগিয়া উঠিবার কোন বিকল্প নাই।