আলোকপাত

“নিম গাছ—প্রকৃতির এক দাওয়াখানা”

বৃক্ষ মানবজাতির সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বৃক্ষ রক্ষা মানে নিজেদের জীবনকে রক্ষা। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়, মাটিকে শীতল রাখতে গাছপালার জুড়ি নেই। বৃক্ষরাজি আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করে বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাতাসের বিষাক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষণ করে। দিনেরবেলায় অক্সিজেনের বৃদ্ধি ঘটায়। তাছাড়া ছায়া প্রদান ছাড়াও জ্বালানি, আসবাবপত্র, গৃহ নির্মাণসামগ্রী ও পরিবেশের সৌন্দর্যের এক স্বর্গীয় উদ্যান হিসাবে চিহ্নিত করতে বৃক্ষরা তুলনাহীন। বৃক্ষরাজির মধ্যে প্রাণী ও উদ্ভিদকূলের জন্য নিম বৃক্ষের মত এত উপকারী বৃক্ষ অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি। নিমের নানাবিধ গুণাগুণের কথা বিবেচনা করেই বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা নিমকে “একুশ শতকের বৃক্ষ” বলে ঘোষণা করেছে। মানবজাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো সুস্থ জনগোষ্ঠী। আর এই সুস্থ জনগোষ্ঠীর জন্যে প্রধান প্রয়োজন নির্ভেজাল খাদ্য এবং নিরোগ স্বাস্থ্য। নিমকে বলা হয় “প্রকৃতির দাওয়াখানা”। যার দ্বারা ফসলের কীটপতঙ্গ এবং প্রাণীকুলের রোগ দমন করা সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা নিম গাছকে বলেছেন— “A tree for saving Global Problems”। ভারতে অসংখ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে— নিমভিত্তিক। যা হতে তারা নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে আয় করছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে অনেক মানুষের। সৌদি আরবের মত দেশও রোপণ করেছে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) নিম গাছ। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও নিম সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমাদের দেশের আবহাওয়া নিম চাষের জন্য বেশ অনুকূল। বহুবিধ গুণ এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় নিম গাছ আমাদের দেশের জন্য কতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিমের ব্যাপক বিস্তার এবং নিমভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে অন্যদিকে নিম জাতীয় দ্রব্য দেশের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে। বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বিগত কয়েক বছরে সারাদেশে প্রায় কয়েক কোটি নিমের চারা লাগানো হয়েছিল। ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতায় নগরীর যে সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল তার একটি বড় অংশই ছিল সড়কদ্বীপ ও খোলা জায়গাগুলোতে বৃক্ষ রোপণ। যদিও এর বেশিরভাগ নিম বৃক্ষই বেঁচে নেই। যেসব প্রতিষ্ঠান সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব নিয়েছিল তারা সেগুলোর পরিচর্যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। এছাড়া মানুষজনও সহায়তা করেনি। রাস্তা পারাপারের জন্য “পথচারী পারাপার” ব্যবহার না করে সড়কদ্বীপের নিরীহ গাছগুলোকে নিষ্ঠুর পায়ে মাড়িয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে রাস্তা পার হয়েছে। যাইহোক, ইদানিং সড়কদ্বীপগুলোতে কাঁটা তারের বেড়া আর নানাবিধ গাছের সমারোহ সত্যিই মন কাড়ে। সড়কদ্বীপগুলোর গাছের ছায়া আর অক্সিজেনযুক্ত নির্মল বায়ু ইট-পাথরের গড়া শহরের মানুষের অন্তরে অনেক প্রশান্তি এনে দেয়। চলুন, এখন থেকে আমাদের শপথ হবে নিম গাছ লাগাবো, গাছের পরিচর্যা করবো। এতে শহরের সৌন্দর্য আর স্নিগ্ধ পরিবেশ অনেক বৃদ্ধি পাবে। কল্পনায় একটু ভাবুন, সড়কদ্বীপগুলোতে সারিবদ্ধভাবে সমান দূরত্বে একের পর এক নিম গাছ লাগান আছে, কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই সৃষ্টি হবে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক স্বর্গীয় কানন। পরিশেষে বলব, নিম খুলে দিতে পারে বাংলাদেশের মত নিম্নআয়ের উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় যোগ হতে পারে নতুন আরো একটি দেশীয় পণ্য যা প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে। আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে নিম দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের ওষুধ, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিস। দিন দিন এইসব নিমসামগ্রীর মৌলিক উপাদান বিশেষ করে বীজের চাহিদা বাড়ছে, ফলে বীজ সংগ্রহ ও প্রসেসিং-এর ক্ষেত্রে আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান-এর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া নিমই একমাত্র গাছ যা থেকে বাণিজ্যিকভাবে বায়ো-কীটনাশক প্রস্তুত হচ্ছে যা পরিবেশবান্ধব। এক কথায় নিম গাছ আল্লাহতায়ালার এক উত্তম দান। মনে রাখতে হবে, যেখানে নিম গাছ আছে সেখানে অনেক প্রকার বায়ুবাহিত রোগ-ব্যাধি মুক্ত থাকে। নিম গাছকে বিজ্ঞানীরা আগামী শতকের মহামূল্যবান বৃক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তাই নিম গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে সরকারসহ সকল স্তরের লোকজনকে আরো স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে এ দেশ হবে বিশ্ব দরবারে নন্দিত। লেখক : ব্যাংকার