যেতে যেতে পথে পথে
কথা যখন শিক্ষণপ্রশিক্ষণের কথা যখন নীতি-নৈতিকতার
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:২৮
শিক্ষণপ্রশিক্ষণের আসরেতো আপনাকে কথা বলতে হয়।
বলতে হয়। অনেক কথা বলতে হয়। বিভিন্ন বিষয়ে বলতে হয়।
কাজটিতো মোটামুটি শিক্ষকতার মতই।
মোটামুটি নয়, গোটাগুটিও নয়। পুরোপুরিই এটি শিক্ষকতার কাজ।
কিন্তু, শিক্ষকতার কাজ করার জন্যতো আপনি উপযুক্ত কোন মানুষ নন! আপনারতো সে উপযোগিতা নেই!
আপনার অনেক সাহস। সাহস আছে বলেই হয়তো আপনি সীমাবদ্ধতাকে ডিঙ্গোতে পারেন,
অনেকটা উন্মাদের মত।
উন্মাদরা কিন্তু খুব ভালো লোক নয়।
নতুন কথা শোনাচ্ছেন মনে হচ্ছে!
মোটেই নতুন কথা নয়। আমাদের দেশের অতি বিশিষ্ট ও ভাগ্যপ্রসন্ন ব্যক্তি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়ে গেছেন উন্মাদ ও শিশুরা পক্ষপাতহীন হয় এবং শিশু ও উন্মাদ ছাড়া সংসারে কেউ নিরপেক্ষ হয় না।
ঠিক আছে, শিশুতোষ সারল্যে ও শংসনীয় নিরপেক্ষতায় প্রশিক্ষণের ক্লাসরুমে আপনি কী কী বলেন, যদি জানান।
আমি অনেক ভেবেচিন্তে দু’তিনটে কথা বলি।
এক. প্রশিক্ষণ শুধু জানায় না নতুন কিছু শেখায়ও না, প্রশিক্ষণ পুরনো জিনিস, অশুদ্ধ জিনিস ও ভ্রমকন্টকিত জিনিস ভুলিয়েও দেয়।
দুই. ট্রেইনিং ইজ দ্য বেস্ট অ্যাসিসট্যান্স বলে বিখ্যাত একটি উক্তি আছে। আমাদের বুঝতে হবে কেন এই কথাটি বলা হয়, কেন মানা হয় যে প্রশিক্ষণ সর্বোত্তম সহায়তা।
সর্বোত্তম সহায়তা এ কারণে যে প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্য কোন সহায়তা বার বার নেয়া যায় না। যে গ্রহণ করে তার মধ্যে লজ্জা ও ক্ষুদ্রতার বোধ উপস্থিত হয়। আর সাহায্য যিনি দেন তার মধ্যে বিরক্তি ও ক্রোধের বোধ উপস্থিত হয়। প্রথমজন ভাবেন, আমি এমন কেন হতভাগ্য হিসেবে নিজেকে বার বার প্রমাণ করবো যে, সাহায্য ছাড়া আমার চলে না এবং বার বার আমার হাত পাততে হয়।
আর কেউতো আমার মত হাত পাতে না।
সাহায্যের এই যাচনা ও প্রার্থনা অনেককিছুর জন্যই হতে পারে। যেমন অন্ন, বস্ত্র, অর্থ, বাসস্থান গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি শতকিছু।
যিনি সাহায্যের হাত একদিন স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই বাড়াতেন তিনিও একদিন হাত গুটিয়ে নেবেন। ভাববেন লোকটি আমার কাছেই কেন হাত পাতে শুধু। আমার ক্ষমতারওতো একটা সীমা আছে। কতদিন আমি ওকে টেনে চলবো?!
কিন্তু, প্রশিক্ষণের ব্যাপারটি আলাদা। এটি এমন এক সাহায্য যা সবসময় নেয়া যায়। সে জানে বয়সে সে যদি ছোটও হয়, তার কাছ থেকেও নেয়া যায়। এটি যেকোন বয়সে নেয়া যায়। এটি নিতে কোন লজ্জা নেই, দিতে কোন ক্লান্তি ও বিরক্তি নেই। তাই এর চেয়ে বড় কোন সহায়তা নেই, তাই ট্রেইনিং ইজ দ্য বেস্ট অ্যাসিসট্যান্স।
আর কী বলেন, ট্রেইনিং নিয়ে?
চীন দেশের এক প্রবাদ টেনে বলি। সেটিকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তুলি।
বলি, চীন দেশে একটি কথা চালু আছে এরকম ঃ যদি কাউকে মাছ খাইয়ে তুষ্ট করতে চাও, তাকে বেলা দু’বেলা নিমন্ত্রণ করে খাওয়াও, আর যদি তাকে চিরদিনের জন্য মাছ খাওয়ার আনন্দ দিতে চাও, মাছের চাষটি তাকে শিখিয়ে দাও। আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন, মাছের চাষ শিখিয়ে দেয়ার অর্থ কী?!
তাহলে ট্রেনিং নিয়ে কথা আপনার ফুরোলো?
না ফুরোলো না। শেষ কথাটি হচ্ছে, ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ বা প্রকৃষ্টরকম শিক্ষণ শেখায় না শুধু, ভোলায়ও। এটি নতুন জিনিস শেখায়, শুদ্ধ জিনিস শেখায়, আধুনিক জিনিস শেখায় ও ভুল জিনিস ভোলায়, অনাধুনিক ও পুরনো জিনিস থেকে সরায়। প্রশিক্ষণ নতুন কিছু শেখাক না শেখাক, জানা জিনিসকে নবায়ন অবশ্যই করে দেয়।
এর আলোর দিকটি ছাড়া কালোর দিকওতো আছে!
আছে। এটি বিষয় নিয়ে কথা, উদ্দেশ্য নিয়ে কথা, প্রশিক্ষক নিয়ে কথা, অভিভাবক নিয়ে কথা, দেশপ্রেম নিয়ে কথা। যে কথা বলে—‘ফুল হইতে ভ্রমর আহরণ করে মধু, মাকড়সা বিষ’ সে কথা নিয়ে কথা। কোন্ শেখায় মন বসাবো, কোন্ শেখায় প্রেম জড়াবো কিংবা আগ্রহ ঢোকাবো-সে আমার ব্যাপার, আপনার ব্যাপার, প্রশিক্ষার্থীদের ব্যাপার।
লেখক :শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক