আসল ও
নকল
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৯
কলম আসল। কলমবাজ নকল। ‘বাজ’ ফারসি প্রত্যয়। এর অর্থ দক্ষ, অভ্যস্ত। তবে কলমবাজিতে কারসাজি আর ভোজবাজি থাকলেই যতো বিপত্তি। কলমবাজ বাজিকরী কাজ করে। দৃশ্যতঃ বাজিমাত্ করলেও এর মর্মে মর্মে থাকে মতলববাজি। পরতে পরতে থাকে স্বার্থপরতা। শুভবোধ আটকে থাকে স্বার্থ-শৈবালে। একজন শাসক, হাকিম, নেতা বা নির্বাহীর কলমের একটা নকুলে খোঁচা পূত-পবিত্র চরিত্রে লেপ্টে দিতে পারে অমোচনীয় কলংক কালি। এমন কালি, যে কালি বঙ্গোপসাগরের সমস্ত জল দিয়ে ধূয়েও মোছা যায় না। গঙ্গাজলে সিনান করেও সে কলংকের মোচন হয় না। সেই খোঁচা নিষ্পাপ চরিত্রে এমন গভীর ক্ষত এঁকে দিতে পারে, যে ক্ষত সারা জীবনের সাধনায়ও শুকায় না। পৃথিবীর কোন মলমই সেই ক্ষতের আরোগ্য-প্রলেপের যোগ্য হয় না। তাই যারা ‘কলম চোর’ তাদের চেয়ে বেশি ঘৃণ্য তারা— যারা ‘কলম দিয়ে’ চুরি করে। ‘কলম চোরের’ শাস্তি যতটা হয়, ‘কলম দিয়ে চুরি করা চোরদের’ শাস্তি ততটা হয় না বলেই সমাজ-দেহে এমন গনগনে ক্ষত। তাই কলম অবলীলায় সাধুকে চোর আর চোরকে সাধুর সনদপত্র দেয়। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্যের প্রত্যয়ন দেয়। আসলকে নকল আর নকলকে আসল বলে কলম বসিয়ে দেয়। কলমের কালির নিজের কোন রং নেই। কলমীর মনের রংই কলমের নিব বেয়ে কাগজের বুকে ঝরে পড়ে। তাই সকল লিখাই কলমীর মনোভঙ্গীর প্রতিফলন- সে ভঙ্গি আসল হলে চিত্র আসল, সে ভঙ্গি নকল হলে প্রতিফলও নকল। কলম লেখক নয়; লেখনি। কর্তা নয় করণ। কলম যে কলাম লিখে সে কলাম কমলা, নাকি মাকাল— তার প্রভেদ করবার জন্য চাই আসলের পরিচর্যা, আসলের সনিষ্ঠ অনুশীলন। চাই আসলের পালন, নকলের দমন।
আয়াস পূজনীয়, আয়েশ বর্জনীয়। আয়াস সত্যের সপর্যা। আয়াস প্রয়াস বটে তবে তা আয়েশী প্রয়াস নয়। এটা শ্রম লব্দ। ঘামের লোনা জলে প্রাণ পায়। আয়েশ আরামপ্রদ। আর আয়াস আরামকে হারাম করে। আয়াস আয়সের মতই লৌহকঠিন। এই আয়স আয়াসীদের বর্ম। মধুকবির ‘আয়সী আবৃত দেহ’ সে ব্যঞ্জনাই দেয়। শ্রমের বর্ম আয়াসকে সুরক্ষা দেয়। আসল কষ্ট-ক্লিষ্ট বলেই বলা হয়, ‘কষ্ট করিলে কেষ্ট মিলে’। কেষ্ট যেমন কৃষ্ণ, তেমন ফলও। কষ্ট ছাড়া ভক্ত কৃষ্ণকে পায় না। আবার অভীষ্ট ফল লাভের জন্যও দরকার কষ্টের। কর্মকুশল হাতের হাতিয়ার হাতুড়ে নয়। শক্ত হাতুড়ি। এ হাতুড়ি পাথর ভাঙ্গে। লোহা পেটায়। শিলা কাটে। এ হাত ‘কঠিনেরে ভালবাসে’। তাই সে বঞ্চনার শিকার হলেও প্রবঞ্চনা জানে না। প্রতারণাকে প্রশ্রয় দেয় না। কৌশলের কূটচালে কিচ্ছু হাতিয়ে নেয় না। কর্মকুশলতা তার কাছে কোহিনূর। কষ্টক্লেশে দগ্ধ হয়েই মানুষ কষ্টিপাথর হয়। কষ্টে কষ্টে কষ্টিপাথর হওয়া মানুষ আসল মানুষ। নকলের প্রলোভনে নষ্ট হয় না, পথ হারায় না। নকল তাকে নাকাল করতে পারে না। কারণ তখন সে নীলকণ্ঠ, সব্যসাচী, অকুতোভয়। বিপর্যয় তাকে পর্যুদস্ত করে না, পরাস্ত করতে পারে না। তখন সে নকলের কাছে পরাভব মানে না। সে সোজা পথে চলে। অন্ধ যাত্রীও তিমির রাত্রিতে পথ দেখে দীব্য দীপালোকে।
শাসন ভীতিকর। সেবা প্রীতিকর। কল্যাণের কানাই। প্রগতির প্রসন্ন প্রসূন। তাই সেবা ও শাসনে ভারসাম্য দরকার। কর্ম ও ভাষণে দরকার সাযুজ্য। সেবার নামে শাসন নিযুত সমস্যার জন্ম দেয়। শাসন ধন জয় করে। সেবা মন জয় করে। শাসনের আসন যতোই মজবুত- তা আসলে বুদ্বুদ্। শাসনের গদি টলমলে হয়। সেবার সিংহাসন অটল থাকে প্রাণের পাটাতনে। তাই এ সিংহাসনের ভিত মজবুত। রাজনীতি শুধু ‘রাজ’ করবার নীতি নয়। রাজত্ব করবার কুটকৌশলও নয়। সেবার প্রীতিময় নীতির নাম রাজনীতি। রাজনীতিও শিল্প। এ শিল্পের নাম সেবা-শিল্প। হ্যাঁ। তা সেবা-আশ্রম নয়। ‘দুষ্টের দমন-শিষ্টের পালন’ এর মূলমন্ত্র। ফন্দি-প্রবঞ্চনা এর সঙ্গে যায় না। সততার আবরণে শঠতা একে মানায় না। কারণ হঠকারিতার মাধ্যমে মহত্ অর্জন হয় না। কৌশলের কানাগলি দিয়ে এ শিল্প হাঁটে না। কল্যাণের রাজপথ দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে এ শিল্পের চর্চা করতে হয়। চোরাগলিতে গেলে তা চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। তখন জনতা রুষ্ট হয়। কংস বধের কানাই হয়। বলে— ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান’।
প্রজাপ্রীতিই আসল রাজনীতি। স্বজনপ্রীতি দুর্নীতি। আধুনিক বিশ্বে রাজনীতি নিরপেক্ষ কিচ্ছুটি নেই। রাজনীতিবিদদের চলার পথেই বিছানো থাকে জনগণের বহু লালিত স্বপ্ন। তাদের হাতেই ক্ষমতার দণ্ডের পাশাপাশি প্রগতির পতাকা তুলে দিয়ে জনগণ প্রার্থনা করে- ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবার দাও শকতি’। মেহনতি মানুষের ঘামে, শহীদের তাজা খুনে, আর মায়ের বিলাপের অশ্রু ধারায় সিক্ত ও উর্বরা আমাদের সোনা-ফলা প্রিয় স্বদেশ। আরোপিত যে কোন সংকট রক্ত ঝরাবে। মনে রাখতে হবে—কুটিল সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে। সমাধান দেয় না। রাজনীতিবিদদের পথে পথে সাধারণ্যের বিছানো সম্ভাবনাময় স্বপ্নের সফল রূপায়ন চায় তারা। কিন্তু সে স্বপ্ন এতটাই স্পর্শকাতর, এতটাই নাজুক যে, অসতর্ক কোন পদক্ষেপ কিংবা সদম্ভ কোন পদাঘাত একে চুরমার করে দিতে পারে অবলীলায়। গণমানুষের স্বপ্নের উপর দিয়ে হাঁটতে হয় আলতো পায়ে, মৃদুপদে, ভারসাম্য রেখে। কারণ জনগণের স্বপ্নভঙ্গের অপর নাম সর্বনাশ। W.B.Yeats-এর মিনতি ‘I have spread my dreams under your feet; tread softly because you tread on my dreams’.
লেখক: গবেষক