সংঘাত নয় সমঝোতা চাই

বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে এখন দুর্যোগের ঘনঘটা। অথচ যারা রাজনৈতিক মঞ্চের শীর্ষে আছেন, তাদের অবদান কম নয়। তারা ইচ্ছে করলেই এর পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেন। কেননা ইতিপূর্বে তারা দেশের জন্য অনেক গঠনমূলক কাজ করে অনেক ক্ষেত্রে মঙ্গল বয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু সামান্য একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে কেন যে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি করছেন, তা কোনক্রমেই বুঝে উঠতে পারছি না। তাঁরা এমনই ব্যক্তিত্বদ্বয় স্ব স্ব মহিমায় মহীয়ান। সেই পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত যতদূর দেখেছি, আগে অনেক মানুষ না খেয়ে থাকতো। জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক নিচে এবং দারিদ্র্যসীমার কার্ভও ছিল নিম্নগতিমুখী। কিন্তু আজ আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মাঝারি অর্থনৈতিক পর্যায়ের দিকে ধাবমান। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, প্রায় ৩০ বছর আগে আমি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময় বাংলাদেশকে চেনাতে ভারতের মানচিত্র নিয়ে বুঝাতে হয়েছিল। এ কারণে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছিল। অথচ এখন তেমনটি নয়, বলতে গেলে সারাবিশ্বের অধিকাংশ লোক চেনে ও জানেন। আর এক্ষেত্রে শীর্ষে অবস্থানকারী বাংলাদেশের সেই মহান ব্যক্তিদ্বয় উভয়ই ধারক ও বাহক হিসেবে ষোল কোটি মানুষের হূদয় আঙ্গিনায় জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁরা দু’জনই দু’টার্ম করে দেশের কর্ণধার ছিলেন। এখন বাংলাদেশের মানুষ আগের মতো নয়। জ্ঞান-গরিমা ও তথ্য-প্রযুক্তির বলে অনেক বেশি সজাগ। আমার গবেষণামূলক মনোবৃত্ত বিধায় যেখানেই যাই না কেন, সব পর্যায়ের লোকের সাথে প্রত্যহ কথা বলেছি, সাক্ষাত্দাতারা নিজেরাই বুঝেনি যে বর্তমান সংকটকে ঘিরে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থান আমি কৌশলে জেনে নিচ্ছি। আর এতে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমঝোতার বিকল্প নেই। আর রূপকার্থে আমরা এমনই একটি অবস্থানে আছি, যাকে ICU (Intensive Care Unit) বলে অভিহিত করা যায়। এখানে তো আর বেশিদিন থাকা যায় না। Either to general bed or to Azimpur or Banani। হয়তো আপনারা বুঝতে পারছেন আজিমপুর বা বনানী বলতে কি বুঝাচ্ছি। এখানে জেনারেল বেড মানে সমঝোতা অর্থাত্ সুস্থতা, আর আজিমপুর বা বনানীর অর্থ সংঘাত অর্থাত্ জাতীয় বিপর্যের হাতছানি। এইতো কয়েকদিনে অনেক রক্ত ঝরেছে। জনজীবন এখন অস্থির। উত্পাদনশীলতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংকটাপন্ন এবং হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থনৈতিক ক্ষতি (Economic Loss) হয়েছে। আর এই মুহূর্তে চলমান নৈরাজ্য থেকে যদি সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসে। তথাপিও এ সুদূরপ্রসারী ক্ষতিমূলক প্রতিক্রিয়া চলবে বহুদিন ধরে। তাছাড়া ভাবমূর্তি যেভাবে নষ্ট হচ্ছে তাও কম নয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগ কমার আশংকা হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আরও উল্লেখ্য যে, তথ্যমতে জানা যায় যে, প্রতিদিন হরতালজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকার উপরে। আর এর অর্থনৈতিক ক্ষতি তো আরও কয়েকগুণ। এ সূত্র ধরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোশাক শিল্প। একই সাথে বিদেশি শ্রমিক রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা শুরু হয়েছে। সেহেতু আশীর্বাদ হিসেবে এই দুটি খাতের বিদেশি প্রতিযোগীদের কালো হাত ধেয়ে আসছে এবং এভাবে চললে তাদের সুবিধা করার কৌশলী কালো হাত ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিকভাবে অধিকার নিশ্চিত করতে প্রকারান্তরে ধর্মঘটের কথা থাকলেও, কিন্তু এই হরতাল তো সে প্রকৃতি নয়। তাই সঙ্গত কারণেই হরতালের শানে নযুল সম্পর্কে কিছু বলা আবশ্যক বলে মনে করি। উল্লেখ্য যে হরতালের কনসেপ্ট শুরু হয় সুলতানী আমলে কয়েকটি দোকানের নেতিবাচক কার্যকলাপ ঘিরে। তত্পর যে হরতালের দর্শনটি আসে, তা হলো সাম্রাজবাদী ও উপনিবেশবাদী বৃটিশ সরকার তাড়াতে “Quit India” শ্লোগানের আবরণে মহাত্মা গান্ধীজী এটি অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। হরতাল শব্দদ্বয় গুজরাটি শব্দ। “হর” মানে প্রত্যেক, আর “তাল”-এর অর্থ তালা এবং এর সংমিশ্রণে “হরতাল” শব্দটি উঠে এসেছে। এখানে কথাটি এই দাঁড়ায় হরতাল অর্থাত্ পুরোপুরি কাজ বন্ধ করে বৃটিশ সরকারকে অচল করে ফেলা এবং একই সূত্র ধরে পশ্চিম পাকিস্তানীদের হঠাতে হরতাল পালন করা হয়েছে। কিন্তু তখন ছিল অন্য প্রেক্ষাপট। অথচ এখন তো দেশ আমাদের এবং দেশ চালিকাশক্তি হিসেবে সরকার ও বিরোধী পার্টি উভয়ই আমাদের সন্তান হিসেবে আমরা ষোল কোটি মানুষ তাঁদের মুখের দিকে সদা চেয়ে থাকি। কিন্তু এ কি দেখছি? বর্তমানে যে বিষয়টি দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো বাস্তবভিত্তিক গঠনমূলক কিছু করা। বর্তমানে ইস্যু হলো “সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬-কে ঘিরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার”। হ্যাঁ, যা সূক্ষ্মভাবে দেখছি প্রকারান্তরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি মানার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেবল গোল বেধেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নিয়ে। এখন বর্তমান সরকার চাচ্ছেন এই পদে মধ্যবর্তী নির্বাচনকালীন সময়ে সর্বময় প্রধান হিসেবে চলমান “সরকার প্রধান” কাজ চালিয়ে যাবেন। আবার অন্যদিক থেকে বলা হচ্ছে, ঠিক আছে, কিন্তু উনি থাকবে না, তৃতীয় কেউ থাকবেন। অবশ্য সংবিধান মতে এই সরকারের আমলেই নির্বাচন হতে হবে, এর বরখেলাপ সংবিধান পরিপন্থি হয়ে উঠবে। জানা যায় যে, চলতি মাসের শেষের দিকে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে বর্তমান সরকার প্রধানের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সময়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে। এতে অনেকে দৌড়-ঝাঁপ শুরু করলেও একটি সাইড পুরোপুরি নীরব, তাঁরা বলছেন অন্য কথা। বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ। অনেক বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে সবে Take off পর্যায়ে আছে। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি “গরীবের বউ সবার ভাবী”— এই কনসেপ্টের আওতায় আমাদের ঘরের বিষয়টি নিয়ে অন্যরা মাথা ঘামাচ্ছেন, এটি শুভ নয়। একবার বল অন্যের কোর্টে চলে গেলে ফিরে পেতে অনেক ক্লেশ ভোগ করতে হয়। এদিকে এটি সুরাহা করতে কাউকেও বাদ দিয়ে এককভাবে চিন্তা করা যাবে না। এতে আপাতত স্বস্তি আসলেও সুখ-শান্তি আসবে না, যা ইতিহাস চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে থাকে। এর মধ্যেই শহরাঞ্চল থেকে গ্রাম্য জনপদে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন পোলারাইজেশন হচ্ছে একটা স্থায়ী ফলাফল আসবে। কিন্তু বৈশিষ্ট্যগত দিক দিয়ে এ কি রকম পোলারাইজেশন তা বুঝে উঠতে পারি না? এর মধ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয়েছে শুনে খুশি হয়েছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক দিক দিয়ে সকলের পার্টিসিপেশন আবশ্যক, নতুবা চলমান ঘা আপাতত প্রশমিত হলেও, পরবর্তী ঘাতে ক্যান্সার উদ্ভব হওয়ার বিষয়টি খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। একটি কথা মনে রাখতে হবে সব মানুষই সমান। সবারই একটি ভোট। তাই সবিনয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি; কাকেও ছোট বড় বলে নিগৃহীত করবেন না। কেননা প্রত্যেক মানুষ তার চিন্তাধারার রাজত্বে, সে রাজা সেখানে, কারও নাক গলানো ঠিক হবে না। তাছাড়া আরও সবিনয়ে অনুরোধ করবো সবাইকে মর্যাদা দিয়ে কথা বলতে হবে এবং ব্যক্তিগত বিষয়ে এ্যাটাক করে কথা বলা ঠিক হবে না। অর্থাত্ কোন প্রকার বাক্য দূষণের মধ্যে যেন না পড়তে হয়। তাই বর্ণিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে সংঘাত এড়ানোর জন্য সমঝোতার বিকল্প আছে কি না তা জানা নেই। পরিশেষে সবার বিবেকের এজলাসে যথাযথ সম্মান রেখে এই মর্মে একটি কথা বলছি, এই সোনার দেশটি কিন্তু আপনার, আমার ও সবার। এটি বৃটিশ বা পাকিস্তানীদের নয়। যে অবস্থা দেখছি হাতে এতটুকু সময় নেই। এখনই এবং এই মুহূর্তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সমঝোতার ব্যাপারে বর্ণিত পরামর্শ যদি বাস্তবভিত্তিক মনে করেন, তাহলে ভেবেচিন্তে সচেষ্ট হতে পারেন। আবারও বলছি, Days are being counted. তাই সংঘাত নয় সমঝোতা চাই। লেখক: গবেষক