কৃষি জমি রক্ষার উদ্যোগ

কৃষি জমি বাঁচাইবার জন্য সরকার সমবায় ভিত্তিক বহুতল ভবন নির্মাণের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একনেক বৈঠকে ঊর্ধ্বতন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আলোচনাও করিয়াছেন। বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণের মাধ্যমে উত্পাদনশীল কৃষি জমির অপচয় রোধ করার পাশাপাশি জৈব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য বলিয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাইয়াছেন। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে কৃষি জমি রক্ষা করাটা যে অতীব জরুরি ইহাতে সন্দেহ কী! কিন্তু যেই সকল কারণে কৃষি জমির অপচয় হয় সেইসব দিকে সংশ্লিষ্ট মহলের আদৌ কোন চিন্তা-ভাবনা আছে বলিয়া তো মনে হয় না। ফি বত্সর জমিতে অত্যধিক রাসায়নিক প্রয়োগের কারণে জমির উত্পাদনশীলতা হ্রাস পাইতেছে। শিল্পবর্জ্য অপরিকল্পিত ও দায়িত্বহীনভাবে কৃষি জমি এবং পার্শ্ববর্তী নদীনালায় ফেলা হইতেছে। অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি, দালান-কোঠা গড়িয়া উঠিতেছে আর রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণের ক্ষেত্রেও অনেকাংশেই পরিকল্পনার পরী ঘুরিয়া ও উড়িয়া বেড়াইতেছে। অন্যদিকে আবার বেপরোয়া দখলবাজির মাধ্যমে কৃষি জমিতে আবাসন গড়িয়া তোলার যেই হিড়িক—বিশেষ করিয়া বেসরকারি খাতে বৃদ্ধি পাইতেছে তাহাতে অদূর ভবিষ্যতে এই দেশে কৃষি খাত যে জীর্ণ-শীর্ণ মূর্তি ধারণ করিবে ইহাতে কোন সন্দেহই নাই। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশ একদিন ইট-সুরকি, সিমেন্ট বা কংক্রিটের আস্তাবলে পরিণত হইবে ইহা নিশ্চয়ই কেহ কামনা করে না। কিন্তু বাস্তবে যেইভাবে কৃষি জমি বিনষ্ট হইতেছে উহাতে কোন একদিন বাংলাদেশ হইতে যদি কৃষি হারাইয়া যায় তাহা হইলে আশ্চর্যান্বিত হইবার কিছু থাকিবে না। ষোল কোটি মানুষের মুখে আহার জোগাইতে এই দেশের দরিদ্র কৃষকেরা মাথার ঘাম পায়ে ঝরাইয়া অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া চলিতেছে। আর তাহাদের সেই ঘামে ভেজা শরীরের দেখভালের তেমন কোন বন্দোবস্ত না থাকিলেও দেশে প্রচুর কৃষি জমির অস্তিত্ব থাকার সুবাদে তাহারা কৃষি উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রতি বত্সরই অসামান্য সাফল্য বহিয়া আনিতেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির তালে তালে আবাসনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও চাহিদার বৃদ্ধি ঘটিতেছে। ফলে সীমিত সম্পদ ও ততোধিক সীমিত আয়তনের বাংলাদেশের কৃষি জমির উপর চাপ ক্রমবর্ধমান। পরিকল্পিত অর্থনীতি ব্যতিরেকে এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ বহিয়া আনা সম্ভব নহে। শুধু কৃষি নহে, দেশে শিল্পের প্রসারও প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত আয়তনের এই দেশে ঐ উভয় খাতকে সমৃদ্ধ করিতে হইলে চাই সাহস, মনোবল, দেশপ্রেম এবং সুপরিকল্পনা। আবার যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারি কর্মকর্তারা সততা ও নিষ্ঠার সহিত ঐ পরিকল্পনার বাস্তবায়নে যত্নবান না হন তাহা হইলে জাতির ললাটে মহাবিপদের কলংক তিলক শোভা পাইবে বৈকি! বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্যা মিটাইবার পরিকল্পনা এবং তত্সঙ্গে অন্যান্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণপূর্বক কৃষি জমি রক্ষার উদ্যোগ প্রশংসনীয় কেবল তখনই হইতে পারে যখন কিনা সত্যি সত্যি ইহা বাস্তবায়নের পর উহার সুফল দৃশ্যমান হইবে। শিল্প আর কৃষিক্ষেত্রে একটি সুপরিকল্পনাভিত্তিক ভারসাম্য সৃষ্টি করিতে পারিলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন ত্বরান্বিত হইবে তেমনি আবার অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য উত্পাদন ও ব্যাপক কৃষি পণ্য উত্পাদন ও রপ্তানি করিয়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কৃষিনির্ভর শিল্প কৃষি জমিকে বাঁচাইবার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখিতে পারে। যেইসব দেশে কৃষি জমি কম সেই সকল দেশ শিল্পায়নের উপর গুরুত্বারোপপূর্বক উহার জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক চাহিদা মিটাইতে যত্নবান হইয়াছে। অন্যদিকে আমরা যাহারা স্রষ্টার আশীর্বাদস্বরূপ অত্যন্ত উর্বর কৃষি জমি লাভ করিয়াছি তাহাদের উচিত কৃষিকে গুরুত্ব প্রদানপূর্বক শিল্পায়ন ও রপ্তানির উপর সবিশেষ জোর দেওয়া। তাহা হইলেই কৃষি জমি উদ্ধার ও তাহার সত্যিকারের সদ্ব্যবহার সম্ভব হইবে।