এমন হরতাল আর চাই না
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১২
এদেশে কালপরিক্রমায় কখনো বিএনপি কখনো আওয়ামী লীগ পালাবদলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন তারা যে কথাটি বারবার বলেছে তা হলো- ‘হরতাল ক্ষতিকারক। এতে সাধারণ মানুষের জানমালের বেশ ক্ষতি হয়।’ আবার আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় গেছে তাদেরকেও ঠিক একই কথা বলতে শুনেছি। এ ক্ষেত্রে হরতালের ক্ষতির ব্যাপারে তাদের উপলব্ধি একেবারেই অভিন্ন। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে তখন তারা কি বলেছেন?—‘হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার’। আবার বিএনপি যখন বিরোধী দলে তখন তারাও বলেছেন একই কথা। অবশ্য তাদের কথার বেশ যুক্তিও আছে। এদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল হরতাল-ধর্মঘট। নব্বইয়ের আন্দোলনে হরতালই কাজ করেছে গণতন্ত্রের মুক্তির অস্ত্র হিসেবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসার পরও বহু হরতাল হয়েছে। স্বাধীনতার আগে হরতাল হতো পাকিস্তানী শাসকদের মোকাবেলার জন্য। তখন হরতাল ছিল জনমুখী ও স্বতঃস্ফূর্ত। অর্থাত্ জনগণ নিজেরাই হরতাল পালন করতো, এখনকার মতো কাউকে বাধ্য করা হতো না হরতাল পালনে। সে হিসেবেই হরতালকে বলা হয় গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু হরতালের নামে এখন কী হচ্ছে? হরতাল বিএনপি করছে, এর আগে আওয়ামী লীগ বহুবার করেছে। ছোটখাটো দলগুলোও হরতালে কম যায় না। ঘরে বসেই এ কর্মসূচি পালন করা যায়। উপরতলার রাজনীতিকদের জন্য এ পন্থা খুবই সহজ। হালে আলোচিত দু’নেত্রীর ফোনালাপের সময়ও প্রধানমন্ত্রীর ২৮ অক্টোবর দাওয়াতের ব্যাপারে বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছেন: ‘আমিতো হরতালের দিন বের হই না।’ অবশ্য হরতালের সময় বড় নেতারা সাধারণত বের হন না। নিরাপত্তা বলে কথা! হরতালে শীর্ষ নেত্রীরা যেখানে নিরাপদ নন তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা ভাববে কে? নাকি যুগ-যুগ ধরে জনগণ অনিরাপদই থেকে যাবে। দেশের আমজনতার নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের রাজনীতিকদের ভাবনায় আনা উচিত নয় কি? যাইহোক শুরুতে যা বলছিলাম তা হলো দু’নেত্রীই যেহেতু মনে করেন হরতাল ক্ষতিকারক (সময় ভেদে), আর হালে হরতালের ক্ষতির বিষয়টি আমরা উপলব্ধিও করছি তাতে হরতালের বিরুদ্ধে এখনই অবস্থান নেয়া যেতে পারে। আর আইন করে হরতাল বন্ধ করার এখনই মোক্ষম সময় বটে! আর শুরুটা করতে হবে এদের একজনকেই। আর পরে তা মানতে বাধ্য করা হবে অন্যজনকে। বর্তমানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন হরতালের ক্ষতির কথা বলছেন না, হয় আইনটা তিনিই করে ফেলুন না কেন। এমন আইন করতে হবে যেন ক্ষমতার বাইরে থাকা আজকের প্রধানমন্ত্রীও তা মানতে বাধ্য হন। প্রশ্ন হলো: হরতাল-বিরোধী কেমন আইন চাই? এ ব্যাপারে আমার কয়েকটি প্রস্তাব হলো- (১) এখনকার হরতাল মানেই জানমাল নাশ, সে হিসাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরকার শুদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত কম করে ১০ বছর (২ মেয়াদে) হরতাল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা যেতে পারে, (২) হরতাল একেবারে বন্ধ করতে না পারলে সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো বছরে অনধিক ৬টি কিংবা ১২টি হরতাল করতে পারে এ মর্মে আইন করতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে ঐ হরতালের প্রতি কম করে দেশের চলমান ১০টি রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে হবে, (৩) হরতালকালে জানমালের ক্ষতি হলে সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকার হরতাল ডাকা দলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিতে পারে, (৪) পাবলিক পরীক্ষা, বোর্ড পরীক্ষাসহ জনগুরুত্বপূর্ণ কোন দিনে হরতাল ডাকা যাবে না, (৫) কাউকে হরতাল পালন করতে বাধ্য করা যাবে না। হরতালের বিরুদ্ধে এ জাতীয় আইন সহসাই করা দরকার। এ কথাও সত্য যে রাজনৈতিক বিষয় আদালতের দ্বারা সমাধান না করে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা বাঞ্ছনীয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে গণতান্ত্রিক হরতালের বিপক্ষে নই। তবে হরতালের পূর্বাপর নাশকতামূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘোর বিরোধী। ভাষা আন্দোলন, ’৬২’র আন্দোলন, আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন ইত্যাদিতে জনগণের সম্পৃক্ততার কারণে নাশকতা ও সন্ত্রাসমুক্ত হরতাল ছিল একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক হাতিয়ার। এখনকার হরতাল এখন জনগণের সম্পৃক্ততা হারিয়ে ফেলেছে। এখন মানুষ হরতালকে ভয় করে। অথচ দেশের বড় দলগুলো অনেকবারই হরতালের কর্মসূচি না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউই কথা রাখেনি, যা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। এসবের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনের ত্রাহি-ত্রাহি দশা।
সর্বনাশা হরতাল আদৌ কি তাদের কোন স্বার্থরক্ষা করতে পারে? বস্তুত আমাদের দেশে এখন যে ধরনের হরতাল হয় এবং সে হরতাল যেভাবে ‘সফল’ হয়, তা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ছাড়া কিছুই নয়। গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনীতির বিকল্প নেই। সরকারে থাকাকালীন ‘হরতাল করব না’, বিরোধী দলে গেলে ‘হরতাল করব’ এমন দ্বৈতনীতি পরিহার করতে হবে। হরতালের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করতে হবে। আমাদের রাজনীতিকদের হরতালের বিষয়ে ঐকমত্য থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে যেন দেশের অমঙ্গল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জনগণকেও সজাগ থাকতে হবে। সর্বশেষ দু’নেত্রীর কাছে বিনীত প্রার্থনা থাকবে তারা যেন হরতালের বিষয়ে জনগণকে দেয়া তাদের ওয়াদা ঠিক রাখে, প্রয়োজনে হরতালের বিরুদ্ধে আইন করতে হবে। সর্বোপরি দেশকে বাঁচাতে হবে। বিষয়টি নিয়ে ভাববেন এ প্রত্যাশা তাদের কাছে।
লেখক: সাংবাদিক
e-mail : newsstore09@yahoo.com