জলোচ্ছ্বাস

ভয়াল সত্তরের ১২ নভেম্বর

৭০’র জলোচ্ছ্বাসের ফলে উপকূলীয় জনপদে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ভৌগলিক বন্ধনের বাঁধ ছিন্ন-ভিন্ন/লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যায়। লক্ষ মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর বিনিময়ে মুক্তির স্বাদ ও পথ রচনা হয়, মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগমনী হাতছানির মাধ্যমে। মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের ফলে স্বাধিকার আন্দোলন তথা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো ২৬ মার্চ ’৭১। টানা ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে দেশ মুক্ত হলো। ধ্বংস থেকে সৃষ্টির ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর উপকূলীয় এলাকায় ঘটে গেছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস। সেই ভয়াল কালো রাতে উপকূলীয় হাতিয়া, রামগতি, চর আব্দুল্লাহ, সন্দীপ, ঢালচর, চর জব্বার, তজুমুদ্দিন, চর কচ্ছপিয়া, চর পাতিলা, কুকরী কুমড়ী, মনপুরা, চরফ্যাশন, দৌলতখাঁন, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় জলোচ্ছ্বাস হানা দেয়। সরকারি হিসাবে প্রায় ৫ লক্ষ এবং বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১০ লক্ষ আদম সন্তান স্রোতের টানে নদী-সমুদ্র গর্ভে-তীরে-ঢালে, ডালে-জলে-ঝোপে, চরে প্রাণ হারায়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক থাবায় কোটি কোটি টাকার পশু, মত্স্য, ফসল, রাস্তা, কালভার্ট, বাড়ি-ঘর, স্কুল, প্রতিষ্ঠান সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়। ১২ নভেম্বরের ধ্বংস এবং মুক্তিযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের পাশাপাশি শুরু হলো ত্রাণ, পুনর্বাসন, উন্নয়ন তথা ‘মুক্তির’ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ‘সৃষ্টি’র পালা। প্রেরণা ছিল ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টি’। সংগঠন ছিল কুমিল্লা মডেলের সমবায় সমিতি। উত্পাদন করা হয়েছে আলু, চিনাবাদাম, সোয়াবিন, ভুট্টা, যব, গম, ফুলকপি-বাঁধাকপি, লেটুস, লাইন চাষে ইরি। প্রয়োগ করা হয়েছে উচ্চ ফলনশীল বীজ। ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত চাষ পদ্ধতির ট্রাক্টর, লো লিফট পাম্প, থ্রেসার, নিরানী ইত্যাদি। ব্লকে চাষ করতে ভোলা, রামগতি, সুধারামে ট্রাক্টর ওয়ার্কসপ স্থাপন করা হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে বেঁচে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত, মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত, নদী ভাঙ্গা, বেড়ি বাঁধের বাইরে থাকা সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত চর আবদুল্ল্যাবাসীদেরকে নিয়ে চর আলেকজান্ডার এলাকায় পাইলট আকারে ২০০ পরিবার নিয়ে দেশে প্রথম গুচ্ছগ্রাম ‘বিশ্বগ্রাম’ স্থাপিত হয়। নোয়াখালীর ভাটির টেক চরকে ১২ নভেম্বর ও নদী ভাঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য ২৬ মার্চ ১৯৭১ এ স্বাধীনতা ঘোষণার দিনে সৃষ্টির স্মারক হিসেবে তাত্ক্ষণিকভাবে ‘স্বাধীন গ্রাম’ ঘোষণা করলেন মুক্তিপাগল সাবেক এক কূটনীতিক আমলা। যা পরবর্তীতে বিশ্বগ্রাম-গুচ্ছগ্রাম, ঠিকানা-আদর্শ গ্রাম-আশ্রায়ন নামে সারাদেশে স্থাপিত হয়েছে ও চলছে। বোট বিল্ডিং সেন্টার করে জেলেদের মধ্যে নৌকা, জাল, ইঞ্জিনচালিত মত্স্যযান, সঠিক বাজার মূল্যপ্রাপ্তির জন্য কেরিয়ার ভেসেল ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়েছিল-সারা উপকূলীয় এলাকায় মত্স্যজীবী সমবায় সমিতির মাধ্যমে। আর এখন দেশের মানচিত্রে রামগতি-লক্ষ্মীপুর আজ কোটি কোটি টাকা আয়কারী ‘সোয়াবিন জেলা লক্ষ্মীপুর’ নামে পরিচিত। সৃষ্টি জগতের চার (৪) মাখলুকাতকে সৃষ্টিকর্তা সবচেয়ে বেশি শক্তি ও ক্ষমতা দিয়েছেন মাটি, পানি, আগুন ও বাতাস। এর মধ্যে পানির অপর নাম জীবন। আবার এই পানিই খরা, বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, আইলা এ ধরনের ভয়াবহ সব ধ্বংস আনে। বাতাস ছাড়া মানুষ বাঁচে না। আবার এই বাতাসের বেগ বিষাক্ত হয়ে সৃষ্টিকে ধ্বংস করে। পবিত্র কোরআন বলে, ক্ষমতা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর। আল্লাহকে দেয়া হুকুম ও রাসুল (সঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করলেই তার দেয়া সকল শক্তি বা ক্ষমতা আমাদের পক্ষে থাকবে। আর তা না আনলে সৃষ্টিকর্তার অমূল্য সৃষ্টিই যেমন মাটি, পানি, বাতাস, আগুন, ধ্বংস হয়ে কাজ করবে। অশান্তির সমাজ নেমে আসবে যা অরোধ্য। সৃষ্টি ও ধ্বংস সবই আল্লাহর হাতে। যার অন্যতম, দৃষ্টান্ত ১২ নভেম্বর’৭০-এর ধ্বংসের মধ্যে। বাংলাদেশকে দারিদ্র্য মুক্ত করার লক্ষ্যে আল্লাহকে মেনে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ক কার্যক্রমকে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ কেন্দ্রীক সমন্বিত ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ রূপরেখায় এনে তা দীর্ঘ ২০ বছর মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ১২ নভেম্বর ২০১৩ তে এসে ৪২ বছর পরও যখন মনুষ্য সৃষ্ট রাজনৈতিক দুর্যোগ দেখি তখন এই ধ্বংস থেকেও সৃষ্টির একটা পথ আসবে বিশ্বাস করি এবং তার যাত্রা শুরু হবে ‘নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক পরিষদ’ গঠনের মাধ্যমে, প্রকৃত জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। তাহলেই দুর্যোগ, দুর্বিপাকে আত্মত্যাগে বলিয়ান ১২ নভেম্বর বার বার আর ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসবে না বরং সৃষ্টির উন্মাদনা শক্তিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ প্রতিবার-প্রতি বছর। লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও সেক্রেটারী জেনারেল, ডর্প ইমেইল: nouman@dorpbd.org